নওগাঁর বদলগাছী উপজেলায় ব্যাটারিচালিত ভ্যান ছিনতাইয়ের অভিযোগে গণপিটুনির শিকার হয়ে হায়দার আলী (৪৫) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার (১ নভেম্বর) সকালে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।
নিহত হায়দার আলী জয়পুরহাট জেলার ভাতশা ইউনিয়নের দেওনাহার গ্রামের মৃত কহির উদ্দিনের ছেলে। তাঁর ভাতিজা ও পুলিশ সদস্য সবুজ হোসেনের দাবি, তাঁর চাচা কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তিনি ভবঘুরে জীবনযাপন করতেন। ভ্যান চুরির অভিযোগে তাঁকে ধরে মারধর করা হয়েছে এবং সেই মারধরেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ অক্টোবর দুপুরে বদলগাছী উপজেলার বালুভরা ইউনিয়নের বারাতৈল গ্রামের ভ্যানচালক সৌমিককে ৩০০ টাকা ভাড়ার বিনিময়ে নতুন ব্রিজ থেকে আক্কেলপুরে নিয়ে যান হায়দার আলীসহ কয়েকজন ব্যক্তি। অভিযোগ রয়েছে, পথে কৌশলে সৌমিককে দুপুরের খাবার খাওয়ানোর পর তিনি অচেতন বা ঘুমিয়ে পড়েন। এ সুযোগে তাঁর ব্যাটারিচালিত ভ্যান নিয়ে পালিয়ে যান অভিযুক্ত ব্যক্তিরা।
ঘটনার পর সৌমিকের পরিবার আক্কেলপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। একই সঙ্গে ভ্যানের সন্ধানে বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়। শনিবার সৌমিকের পরিবারের সদস্যরা ভ্যানের খোঁজে বদলগাছী থানায় যান। সেখানে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় সিসিটিভি ফুটেজ থেকে পাওয়া ছবি দেখে হায়দার আলীকে শনাক্ত করা হয় বলে জানা গেছে।
এরপর পাহাড়পুর বাজার থেকে তাঁকে আটক করা হয়। ভ্যানে করে থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় থানা মোড়ে পৌঁছালে হায়দার আলী ভ্যান থেকে লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। এ সময় ভ্যানচালক সৌমিকের বাবা ‘চোর পালাচ্ছে’ বলে চিৎকার করলে আশপাশের লোকজন জড়ো হন। একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা তাঁকে মারধর শুরু করে।
স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথম দফায় মারধরের পর তাঁকে মাইক্রোস্ট্যান্ডের একটি চৌকিতে বসানো হয়। কিন্তু সেখানেও তিনি আবার গণপিটুনির শিকার হন। পরে খবর পেয়ে স্থানীয় কয়েকজন ও পুলিশের সহায়তায় তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রথমে বদলগাছী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর অবস্থার অবনতি বিবেচনায় তাঁকে আক্কেলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার সকালে তাঁর মৃত্যু হয়।
আক্কেলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে দায়িত্বে থাকা উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার নাজমুল হক জানান, হায়দার আলীকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধরের অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরে তাঁর মৃত্যু হয়।
আক্কেলপুর থানার পরিদর্শক মেহেদী মাসুদ এবং বদলগাছী থানার পরিদর্শক হাবিবুর রহমান জানান, নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য জয়পুরহাট সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তাঁরা জানিয়েছেন।
ভ্যান ছিনতাইয়ের অভিযোগের তদন্ত এবং হায়দার আলীর মৃত্যুর ঘটনায় কারা জড়িত, তা নির্ধারণ—দুটি বিষয়ই এখন গুরুত্বপূর্ণ। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, চিকিৎসার নথি ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ঘটনার প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটনে সহায়ক হতে পারে। অভিযোগ সত্য কি না, সেটি তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়ার বিষয়। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ উঠলেও আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মারধর বা হত্যা করার অধিকার কারও নেই। আইন অনুযায়ী আটক ও বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অপরাধের অভিযোগের নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।


