পঞ্চগড়ে ট্রেনে পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে এক নারীকে সুপারি বাগানে নিয়ে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে রিফাত হোসেন সাজ্জাদ (২৬) নামে এক যুবককে চরম দণ্ড অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডও করা হয়েছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুরে পঞ্চগড় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক হোসাইন মোহাম্মদ ফজলুল বারী জনাকীর্ণ আদালতে আসামির উপস্থিতিতে বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। সাজাপ্রাপ্ত রিফাত হোসেন সাজ্জাদ পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার মাঝগ্রাম এলাকার আক্তার হোসেনের ছেলে।
মামলার বিবরণ ও পুলিশি তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৪ জানুয়ারি ভোরে পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার কিসমত রেলস্টেশনের অদূরে এক অজ্ঞাতপরিচয় নারীর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। মরদেহের সুরতহাল দেখে প্রাথমিকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ধারণা হয়, সুপরিকল্পিতভাবে হত্যার পর সত্য গোপন ও দুর্ঘটনা প্রমাণের উদ্দেশ্যে মরদেহটি রেললাইনে ফেলে রাখা হয়েছিল।
চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার শুরুতে আটোয়ারী থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হলেও দীর্ঘদিন এর কোনো ক্লু বা রহস্য উদঘাটন করতে পারছিল না পুলিশ। এর কিছুদিন পর ঠাকুরগাঁও জেলার একটি পরিবার উদ্ধারকৃত লাশটিকে তাদের নিখোঁজ মেয়ের হিসেবে শনাক্ত করে এবং ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফন সম্পন্ন করে। তবে এ হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা পুলিশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় দুই মাস অতিবাহিত হলেও ঘাতক অধরাই থেকে যায়। অবশেষে ওই বছরের ৮ মার্চ রাতে কিসমত এলাকায় একটি ইজিবাইক চুরির চেষ্টার সময় স্থানীয় লোকজন সাজ্জাদকে হাতে-নাতে ধরে ফেলে এবং পুলিশে সোপর্দ করে। আটকের পর পুলিশ তার সাথে থাকা মোবাইল ফোন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে। তল্লাশির একপর্যায়ে সাজ্জাদের মুঠোফোনে ইতিপূর্বে উদ্ধার হওয়া সেই অজ্ঞাতপরিচয় নারীর একটি ভিডিও ফুটেজ খুঁজে পায় পুলিশ।
ভিডিওটির সূত্র ধরে পুলিশ সাজ্জাদকে থানায় এনে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। মুখোমুখি টানা জিজ্ঞাসাবাদের মুখে সাজ্জাদ শেষ পর্যন্ত নিজ মুখে ঘটনার কথা স্বীকার করে এবং ওই নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে।
আসামির তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, ২০২৫ সালের ১৩ জানুয়ারি রাতে দিনাজপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে আসা একতা এক্সপ্রেস ট্রেনে চড়ে পঞ্চগড়ে আসার পথে ওই নারীর সঙ্গে সাজ্জাদের প্রথম আলাপ হয়। ট্রেনে ভ্রমণের সময় কৌশলে নারীর বিশ্বাস অর্জন করে সাজ্জাদ। পরবর্তীতে তাকে মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে ট্রেন থেকে কিসমত রেলস্টেশনে নামিয়ে নেয়।
রেলস্টেশন থেকে নির্জনতার সুযোগ নিয়ে সাজ্জাদ ওই নারীকে স্টেশন সংলগ্ন একটি পরিত্যক্ত ঘর এবং পার্শ্ববর্তী একটি সুপারি বাগানে নিয়ে যায়। সেখানে ভয়ভীতি দেখিয়ে সাজ্জাদ তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করে। একপর্যায়ে ভুক্তভোগী নারী সাজ্জাদের কাছে নিজের মোবাইল ফোন ও টাকা দাবি করেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হলে ক্ষিপ্ত হয়ে সাজ্জাদ তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।
হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা আড়াল করতে ও পুলিশের নজর অন্যদিকে ঘোরাতে সাজ্জাদ নিহতের মরদেহ সুপারি বাগান থেকে টেনে এনে পাশের রেললাইনের ওপর ফেলে রেখে এলাকা ছেড়ে চম্পট দেয়। পরবর্তীতে সমস্ত ঘটনা নিশ্চিত হয়ে আটোয়ারী থানা পুলিশ বাদী হয়ে সাজ্জাদের বিরুদ্ধে একটি সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলা দায়ের করে।
পরবর্তী সময়ে পুলিশ দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র জমা দেয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত মামলার নথিপত্র, বৈজ্ঞানিক আলামত ও সাক্ষীদের প্রদান করা সাক্ষ্য-প্রমাণ সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করেন। আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত আজ বহুল কাঙ্ক্ষিত এই রায় ঘোষণা করেন।
রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) খলিলুর রহমান সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, রায়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে মামলার তথ্য-প্রমাণ ও বহু সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ট্রাইব্যুনাল আসামির চরম শাস্তি নির্ধারণ করেছেন। সমাজকে অপরাধমুক্ত রাখা এবং এই ধরনের জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে এই রায় একটি দৃষ্টান্তমূলক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।


