মাগুরায় পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাকের হোসেন হত্যা এবং প্রায় তিন কোটি টাকা মূল্যের ১৫০ ভরি স্বর্ণ ডাকাতির ঘটনায় জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি গোলাম জাহিদকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ভোরে রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
একই ঘটনায় এর আগে রাজনৈতিক দলের কয়েকজন নেতাসহ মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডাকাতি হওয়া স্বর্ণের কয়েকটি বার উদ্ধার এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তবে যুবদল নেতা হত্যা ও স্বর্ণ ডাকাতির ঘটনা একই অপরাধচক্রের পরিকল্পনার অংশ কি না, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা।
মাগুরার পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন জানান, সাকের হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই গোলাম জাহিদকে খুঁজছিল পুলিশ। তিনি আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় তাঁকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত ছিল। মঙ্গলবার ভোরে ঢাকার উত্তরা এলাকা থেকে তাঁকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ ও মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ ঘটনায় এর আগে পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. মারুফ হোসেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য রনি শিকদার (৩৮), শামিমা ইয়াসমিন লুবনাসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে রনি শিকদার, শামিমা ইয়াসমিন লুবনা ও মারুফ হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান জানান, হত্যাকাণ্ডের পরদিন রাতেই রনি শিকদার ও শামিমা ইয়াসমিন লুবনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যসহ অন্যান্য সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তদন্তে ডাকাতি হওয়া স্বর্ণ উদ্ধারের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তার মারুফ হোসেনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাঁচটি সোনার বার জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া ডাকাতির স্বর্ণ কেনাবেচা বা গোপন করার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে ঝিনাইদহের ‘গিনি হাউস’ নামের একটি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের মালিক অনিমেষ মজুমদারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে উদ্ধার হওয়া পাঁচটি সোনার বারই ডাকাতি হওয়া ১৫০ ভরি স্বর্ণের অংশ কি না, বাকি স্বর্ণ কোথায় রয়েছে এবং এর সঙ্গে আর কারা জড়িত—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। পুলিশ বলছে, তদন্তের স্বার্থে বিভিন্ন দিক যাচাই করা হচ্ছে।
যেভাবে খুন হন সাকের হোসেন
মামলার সূত্রে জানা যায়, নিহত সাকের হোসেন মাগুরা শহরের পারনান্দুয়ালী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে রয়েল এক্সপ্রেসের কাউন্টার মাস্টার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত ২১ অক্টোবর ভোরে তিনি কাউন্টারে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ সময় দুটি মোটরসাইকেলে করে কয়েকজন দুর্বৃত্ত সেখানে আসে।
দুর্বৃত্তরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। গুলিবিদ্ধ সাকের নিজের চেয়ারে বসা অবস্থাতেই লুটিয়ে পড়েন। আকস্মিক এ হামলায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে তাঁকে উদ্ধার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়।
প্রকাশ্য স্থানে দায়িত্ব পালনরত একজন ব্যক্তিকে এভাবে গুলি করে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে এসে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ায় তাদের শনাক্ত করা এবং ঘটনার পেছনের পরিকল্পনা উদ্ঘাটন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
দুটি ঘটনার যোগসূত্র খুঁজছে পুলিশ
সাকের হোসেন হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি প্রায় তিন কোটি টাকা মূল্যের ১৫০ ভরি স্বর্ণ ডাকাতির ঘটনাটিও তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো পরিকল্পিত যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। একই ব্যক্তি বা অপরাধী চক্র উভয় ঘটনায় জড়িত কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।
পুলিশের ধারণা, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ, উদ্ধার হওয়া স্বর্ণের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পারস্পরিক যোগাযোগ বিশ্লেষণ করলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হতে পারে। এ জন্য জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা শাখা যৌথভাবে কাজ করছে।
পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন জানিয়েছেন, দুটি ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। গ্রেপ্তার গোলাম জাহিদসহ অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং পাওয়া তথ্য যাচাই করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক পরিচয় সামনে আসায় ঘটনাটি স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হওয়ার বিষয়। সাকের হোসেন হত্যার প্রকৃত কারণ, স্বর্ণ ডাকাতির সঙ্গে এর সম্পর্ক এবং অপরাধে জড়িত প্রত্যেকের ভূমিকা নির্ধারণের জন্য এখন তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা।


