দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত এ রোগে আক্রান্ত হয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ১০ জন। এ নিয়ে চলতি ২০২৬ সালে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩৯ জনে। প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা বাড়তে থাকায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনই ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা। বাকি একজনের মৃত্যু হয়েছে বরিশাল বিভাগে। মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান থেকে রাজধানীসহ ঢাকা বিভাগের ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে অন্যান্য বিভাগেও নতুন রোগী শনাক্ত এবং হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
গত এক দিনে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৯৪৩। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ২৪৫ জন এবং খুলনা বিভাগে ২৩৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বরিশাল ও রাজশাহী বিভাগে সমানসংখ্যক ২১৯ জন করে রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেছেন।
এ ছাড়া রংপুর বিভাগে ৬৫ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৬০ জন এবং সিলেট বিভাগে ২৪ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থাৎ দেশের আটটি বিভাগেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর উপস্থিতি রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের পর চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল ও রাজশাহী অঞ্চলে রোগীর চাপ তুলনামূলক বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৪৩৯ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে প্রাণ হারিয়েছেন ২০৮ জন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেক। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু খুলনা বিভাগে, যেখানে এ পর্যন্ত ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বিভাগভিত্তিক মৃত্যুর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বিভাগে ৪৩ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩৭ জন, বরিশাল বিভাগে ৩০ জন এবং রাজশাহী বিভাগে ২৯ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া রংপুর বিভাগে আটজন এবং সিলেট বিভাগে চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
বিভাগভিত্তিক ডেঙ্গুতে মৃত্যুর চিত্র
| বিভাগ | মৃতের সংখ্যা |
|---|---|
| ঢাকা | ২০৮ |
| খুলনা | ৮০ |
| চট্টগ্রাম | ৪৩ |
| ময়মনসিংহ | ৩৭ |
| বরিশাল | ৩০ |
| রাজশাহী | ২৯ |
| রংপুর | ৮ |
| সিলেট | ৪ |
| মোট | ৪৩৯ |
ডেঙ্গু সাধারণত এডিস মশার কামড়ে ছড়ায়। জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এ মশা বংশবিস্তার করে। বাসাবাড়ির ফুলের টব, অব্যবহৃত পাত্র, পানির ট্যাংক, ছাদের জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত টায়ার কিংবা বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীতে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। ফলে শুধু সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়েও সচেতনতা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বরের পাশাপাশি মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং ত্বকে র্যাশ দেখা দিতে পারে। তবে জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং জমে থাকা পানি অপসারণের বিকল্প নেই। দিনের বেলায়ও এডিস মশা কামড়াতে পারে বলে মশারি ব্যবহার, শরীর ঢাকা পোশাক পরা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মশা প্রতিরোধক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং আগে থেকেই শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন এমন রোগীদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
এক দিনে ছয়জনের মৃত্যু এবং দুই হাজারের বেশি রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। পরিস্থিতির উন্নয়নে মশক নিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা, প্রয়োজনীয় জনবল ও রোগী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদের নিয়মিত সচেতনতা ও অংশগ্রহণই পারে সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে।



