ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধসহ তিন দফা দাবিতে সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ আরও তীব্র হয়েছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) আন্দোলনের পঞ্চম দিনে বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে পুলিশ, শ্রমিক ও সাংবাদিকসহ অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। হামলার শিকার হয়েছেন পাঁচ গণমাধ্যমকর্মী। এ সময় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের তিন প্লাটুন মোতায়েন করা হয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে শিল্পাঞ্চলের শতাধিক পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সংঘর্ষ ও সড়ক অবরোধের কারণে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
শিল্প পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুধবার সকাল থেকেই হেমায়েতপুর, উলাইল, নিশ্চিন্তপুর ও নরসিংহপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
সকাল সোয়া ৮টার দিকে হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড়ে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের সামনে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এর কিছুক্ষণ পর সকাল ৯টার দিকে সাভারের উলাইল এলাকায় আল মুসলিম গ্রুপের সামনেও শ্রমিকেরা জড়ো হয়ে আন্দোলন শুরু করেন। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে উত্তেজনা বাড়ে। শুরু হয় দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের একাংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। জবাবে পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হেমায়েতপুর-সিংগাইর সড়কে বিক্ষুব্ধ একদল লোক পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। এ ঘটনায় সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম আহত হন। সংঘর্ষের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও আন্দোলনরত শ্রমিকদের মধ্যেও হতাহতের ঘটনা ঘটে।
সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে পাঁচ সাংবাদিকের ওপর হামলা
সংঘর্ষের মধ্যে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন পাঁচ গণমাধ্যমকর্মী। তাঁরা হলেন স্টার নিউজের ঢাকা জেলা প্রতিনিধি আহমাদ সোহান সিরাজী, একাত্তর টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি রাইয়ান বিন আমিন, ক্যামেরাপারসন মো. উজ্জ্বল হোসেন, নিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদক নাজমুল হুদা এবং ক্যামেরাপারসন ইমদাদ হোসেন।
আহত সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষের খবর সংগ্রহের সময় তাঁরা কয়েকজন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকের বক্তব্য নেন। এরপর ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ ধারণ করছিলেন। এ সময় মুখোশ ও মাস্ক পরা একদল ব্যক্তি তাঁদের পরিচয় জানতে চান। সাংবাদিক পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরই লাঠি ও ইট দিয়ে তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয়।
হামলাকারীদের আঘাতে সাংবাদিকেরা আহত হন। পরে আশপাশের কয়েকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান। স্টার নিউজের প্রতিনিধি আহমাদ সোহান সিরাজী অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা তাঁদের ধাওয়া করে মারধর করেছেন।
শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর এমন হামলার ঘটনায় গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংঘর্ষপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের পেশাগত কাজে বাধা না দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
উলাইল এলাকায় দীর্ঘ যানজট, পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে
হেমায়েতপুরের পাশাপাশি উলাইল এলাকাতেও শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। সকাল ৯টার পর শ্রমিকেরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন। এতে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উভয় পাশের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হওয়ায় সাধারণ যাত্রী, পরিবহনশ্রমিক ও পণ্যবাহী যানবাহনকে দুর্ভোগে পড়তে হয়।
পরে বেলা ১১টার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দিলে যান চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
সাভারে দায়িত্ব পালনরত বিজিবি ঢাকা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাইমুন জানান, সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিজিবির তিন প্লাটুন সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং জনদুর্ভোগ বাড়ানোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।
আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানায় কর্মবিরতি ও সাধারণ ছুটি
শ্রমিক অসন্তোষ শুধু হেমায়েতপুর ও উলাইল এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর ও নরসিংহপুর এলাকাতেও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
সকালে হামিম গ্রুপ, শারমিন গ্রুপ, নিউ এজসহ বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিয়েছিলেন। তবে কিছু সময় পর তাঁরা কর্মবিরতি শুরু করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সংশ্লিষ্ট কারখানা কর্তৃপক্ষ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। এরপর শ্রমিকেরা কারখানা থেকে বেরিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।
একপর্যায়ে তাঁরা আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, আশুলিয়ায় ১৭৩টি কারখানার শ্রমিকেরা আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। শ্রমিক অসন্তোষ ও নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের শতাধিক পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এতে পোশাক উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, বুধবার সকালে বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। তবে বহিরাগতদের ইন্ধনে কিছু শ্রমিক কাজ বন্ধ করে কারখানার ভেতরে অবস্থান নেন। দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকায় কর্তৃপক্ষ কারখানাগুলোতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে।
তিনি আরও জানান, দুপুরের দিকে শিল্প পুলিশের আওতাধীন এলাকাগুলোর পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। সড়কে যান চলাচলেও তখন কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিল না।
পুলিশের ভাষ্য, পদ্মার মোড়ে জড়ো হন হাজারো শ্রমিক
ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, বুধবার সকালে হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড় এলাকায় দুই দিক থেকে ৩০ থেকে ৪০ হাজার শ্রমিক জড়ো হন। একপর্যায়ে তাঁরা পুলিশের ওপর আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় সাভার মডেল থানার ওসির গাড়িতে আগুন দেওয়া হয় এবং হামলায় ওসি গুরুতর আহত হন।
তিনি জানান, সাভারে উত্তেজিত শ্রমিকেরা মহাসড়ক অবরোধ করলে পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দেয়। ফলে দুপুরের পর থেকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন রাখা হয়েছে।
মজুরি ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে অসন্তোষ
শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তির প্রথা বন্ধ করা। পাশাপাশি তাঁদের উত্থাপিত আরেকটি দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন পঞ্চম দিনে গড়িয়েছে। তবে মূল সংবাদের বিবরণে তৃতীয় দাবিটি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত। এ খাতে লাখ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের মজুরি, কর্মপরিবেশ, চাকরির নিরাপত্তা এবং শ্রমিক অধিকার নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিলে তার প্রভাব শুধু কারখানার উৎপাদনে সীমাবদ্ধ থাকে না; রপ্তানি কার্যক্রম, সরবরাহব্যবস্থা এবং শিল্পাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়ে।
বিশেষ করে সাভার ও আশুলিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে একাধিক কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি পরিবহন, পণ্য সরবরাহ এবং অন্যান্য সহযোগী খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি ও শিল্পকারখানার উৎপাদন অব্যাহত রাখার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে কার্যকর আলোচনার বিকল্প নেই। শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের কারণ চিহ্নিত করা এবং গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো জরুরি।
একই সঙ্গে শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার নিশ্চিত করা, বহিরাগতদের উসকানি বা সহিংসতা প্রতিরোধ এবং সাংবাদিকসহ সব পেশাজীবীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
বুধবারের সংঘর্ষে অন্তত ৫০ জন আহত, পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, পাঁচ সাংবাদিকের ওপর হামলা এবং শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণার ঘটনা সাভার-আশুলিয়ার শ্রম পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। শিল্পাঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি শ্রমিকদের দাবিগুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করাই এখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।


