বাংলাদেশের ক্রিকেটে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রবাহকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে এটা কি সত্যিই ক্রিকেট, নাকি একপ্রকার ‘সার্কাস’? ঘরোয়া ক্রিকেটে শৃঙ্খলা, নৈতিকতা, আচরণবিধি, দায়িত্ববোধ সব কিছুই যেন ম্লান হয়ে গেছে। নিয়ন্ত্রণহীনতা, সিদ্ধান্তে দ্বৈততা এবং খেলোয়াড় ও বোর্ডের পারস্পরিক অবিশ্বাস এখন দেশের ক্রিকেটে অরাজকতার রূপ নিয়েছে।
২০২৫ ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে (ডিপিএল) তাওহীদ হৃদয়ের নিষেধাজ্ঞা ঘিরে যে নাটক শুরু হয়েছিল, তা যেন আর থামতেই চায় না। এ ঘটনায় সম্প্রতি যুক্ত হয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটাররাও, যার নেতৃত্বে ছিলেন অভিজ্ঞ ব্যাটার তামিম ইকবাল। বিসিবির সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করে কাল দুপুরে তাঁরা বৈঠকে বসেন বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদের সঙ্গে। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে তামিম সরাসরি বলেন, হৃদয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত ‘হাস্যকর’।
ম্যাচ রেফারির দেওয়া দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা এক ম্যাচে নামিয়ে আনার পর সেটিও চলতি মৌসুমে কার্যকর না করে আগামী প্রিমিয়ার লিগে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিবি। কাল ক্রিকেট বোর্ড এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ১৯ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে আম্পায়ার্স কমিটি কর্তৃক জারি করা এবং পরবর্তী সময়ে টেকনিক্যাল কমিটির মাধ্যমে বাতিল হওয়া একটি মেমো যে বিভ্রান্তি ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা তৈরি করেছে, তা বিবেচনায় নিয়ে এবং গভীর পর্যালোচনার পর কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাওহীদ হৃদয়ের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাটি ১২ মাসের জন্য স্থগিত থাকবে।
তবে বাস্তবতা হলো এই সিদ্ধান্ত এসেছে সিনিয়র ক্রিকেটারদের তীব্র চাপে, যা বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে বিরল। অভিযোগ আছে, এর আগে মোহামেডানের চাপে পড়ে হৃদয়ের নিষেধাজ্ঞা এক ম্যাচে নামিয়ে আনা হয়েছিল। এবারও চাপেই শাস্তি কার্যকরের সময় পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমন চাপের মুখে বোর্ডের নীতিনির্ধারকদের নমনীয়তা বোর্ডের গ্রহণযোগ্যতা এবং কর্তৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
এ প্রসঙ্গে গতকাল রাতে গণমাধ্যমকে আম্পায়ার্স কমিটির চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমেদ মিঠু বলেন, ‘হৃদয়ের নিষেধাজ্ঞা পরের মৌসুমে কার্যকর হবে।’ তবে কোড অব কন্ডাক্টে এমন কিছু করার সুযোগ কোথায় আছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো ধারা তিনি দেখাতে পারেননি। মিঠু বলেন, ‘এটি যেহেতু আমাদের নিজস্ব লিগ, তাই বাইলজে নতুন কিছু যুক্ত করা যায় কি না, তা দেখা হচ্ছে।’
মোহামেডান-আবাহনী ম্যাচে আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদের সঙ্গে হৃদয়ের তর্কে জড়ানো নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত। সে ঘটনার পরই হৃদয় শাস্তি পান এবং বিসিবির আম্পায়ার বিভাগের একমাত্র এলিট প্যানেল (আইসিসি) আম্পায়ার শরফুদ্দৌলা সৈকত পদত্যাগ করেন।
গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মিরপুর একাডেমি ভবনে প্রিমিয়ার লিগের বিভিন্ন দলের ক্রিকেটাররা প্রথমে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন। এরপর তামিমের নেতৃত্বে তাঁরা বিসিবি কার্যালয়ে বোর্ড সভাপতি ফারুক আহমেদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিসিবি পরিচালক নাজমুল আবেদিন ফাহিম এবং আম্পায়ার্স কমিটির চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমেদ মিঠু। বিকেলে বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে তামিম দাবি করেন, গত তিন মাসে যা ঘটছে, তাতে ক্রিকেটারদের ‘বেইজ্জত-অপমান’ করা হচ্ছে। তামিম বলেন, ‘হৃদয়ের বিষয়টা হাস্যকর।’
কিছুদিন আগে ডিপিএলের গুলশান-শাইনপুকুরের ম্যাচে সন্দেহজনক কার্যকলাপ অনুসন্ধানে বিসিবির দুর্নীতি দমন ইউনিট যেভাবে ক্রিকেটারদের ‘অভিনয়’ করিয়েছে, সেটি এবং বিপিএলে ফিক্সিংয়ের অভিযোগে ১০ ক্রিকেটারের তালিকা ফাঁসকে অপমান হিসেবে দেখছেন তামিম। তিনি বলেন, ‘গত দুই-তিন মাসে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, সেসব নিয়ে খেলোয়াড়দের মনে কষ্ট আছে। কয়েকটা বিষয় আপনাদের সামনে তুলে ধরতে পারি।’
এরপর তামিম বলেন, ‘গুলশান-শাইনপুকুর ম্যাচে কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছে। আমরা চাই, যদি দুর্নীতি হয়ে থাকে, সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। কিন্তু তাই বলে দুজন খেলোয়াড়কে মিডিয়ার সামনে এনে নাটক করা, এটা কখনোই গ্রহণযোগ্য না। বিশ্বের কোথাও দুর্নীতিবিরোধী তদন্তে অভিযুক্তদের এভাবে উপস্থাপন করা হয় না। এটা খেলোয়াড়দের অপমান।’
বিপিএলের স্পট ফিক্সিংয়ের ঘটনায় অভিযুক্ত ১০ ক্রিকেটারের নাম গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়া নিয়েও সমালোচনা করেন তামিম। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই দোষী হলে যেন শাস্তি হয়। কিন্তু ১০ জনের নাম একসঙ্গে ফাঁস করে দিলে নির্দোষ খেলোয়াড়েরাও অপমানিত হয়।’ একদিকে ক্রিকেট বোর্ডের নীতিনির্ধারকেরা প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, অন্যদিকে ক্রিকেটারদের ক্ষমতা প্রদর্শন—এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে দেশের ক্রিকেট।
খবরওয়ালা/এসআর



