খবরওয়ালা আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১১ জুলাই ২০২৫
‘ইরানের মতো একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রকে ছোট করে দেখা বড্ড ভুল’—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন ফ্রান্সের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু। তিনি বলেন, পশ্চিমা নীতিনির্ধারকেরা ইরানের কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত গভীরতাকে অবমূল্যায়ন করছেন, যা ভবিষ্যতে বড় ভুল হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।
সম্প্রতি ফরাসি সাময়িকী লা ক্লাব-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লেকর্নু এসব কথা বলেন। তাঁর এই বক্তব্য প্রকাশ করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা মেহের।
লেকর্নু বলেন, ‘আমরা (পশ্চিমারা) আসলে ইরানের কৌশলগত, প্রযুক্তিগত, বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক সম্পদের গভীরতাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করি না। ওদের এমনভাবে দেখি, যেন তারা খুবই ক্ষুদ্র একটি দেশ। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন।’
তিনি বলেন, ‘১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে ইরান একাধিক নিরাপত্তাগত সংকট ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেও টিকে আছে এবং এর মধ্য দিয়েই নিজেদের সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।’
লেকর্নুর এই মন্তব্য সম্প্রতি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এসেছে। গত ১৩ জুন ইসরায়েল একতরফা ও উসকানিমূলক হামলা চালিয়ে ইরানের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা ও পরমাণু বিজ্ঞানীকে হত্যা করে। এরপর ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়, যা জাতিসংঘ সনদ ও এনপিটি চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ইরান পাল্টা জবাবে ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটিতে মোট ২২ দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে থাকা সামরিক ঘাঁটিগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করে। এসব আঘাতে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়। শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল কার্যত রণভঙ্গ দেয়, যার ঘোষণা আসে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে।
এই প্রেক্ষাপটে লেকর্নু বলেন, ‘গত দুই দশকে ইরান তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেটাকে এখন আর কিছু বিজ্ঞানীকে হত্যা করে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। এতে হয়তো সাময়িক ভয় তৈরি করা যায় বা কিছুটা বিলম্ব হয়, কিন্তু পুরো জ্ঞানের ভিত্তি মুছে ফেলা যায় না।’
ফরাসি প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও জানান, ইরান বর্তমানে ক্ষেপণাস্ত্র চালন প্রযুক্তিতে পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করেছে, যেটিকে তিনি ‘সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বিস্ময়কর অগ্রগতি’ বলে বর্ণনা করেন।
ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদোতে হামলায় কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে প্রকৃত চিত্র জানতে হলে আমাদের সত্যিকার অর্থেই মাটির নিচে নামতে হবে।’ তাঁর এই মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলো মূলত ভূগর্ভে নির্মিত ও সুরক্ষিত, এবং সেগুলো সহজে ধ্বংস করা সম্ভব নয়।
উল্লেখ্য, ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে শান্তিপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় পরিচালিত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সন্দেহ, চাপ এবং কখনো কখনো সরাসরি হামলার পথ বেছে নিচ্ছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ফরাসি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য হয়তো পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতে এক নতুন বোধোদয়ের ইঙ্গিত। যেখানে ইরানকে আর ‘সহজ প্রতিপক্ষ’ হিসেবে দেখা যাবে না, বরং তাকে কৌশলগত ও প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম একটি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করার সময় এসেছে।
খবরওয়ালা/এন