নিজস্ব স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশ: সাফ জানালেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে যে কোনো সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হবে না—এমনই এক জোরালো বার্তা দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বুধবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, অন্য কোনো দেশ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন বা প্রতিরক্ষা উদ্যোগ নিয়ে কী মনোভাব পোষণ করছে, তা ঢাকা বা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলবে না।

ড্রোন নির্মাণ কারখানা ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট

সম্প্রতি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে যে, বাংলাদেশ চীনের সহযোগিতায় একটি ড্রোন নির্মাণ কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। বিষয়টি নিয়ে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে নানা আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ হোসেন বলেন, “বাংলাদেশ যদি অন্য দেশের সহযোগিতায় কোনো কারখানা করার চিন্তা করে, সেটা নিজের স্বার্থেই করবে। অন্য কে এ নিয়ে কী মনে করে, তাতে কিছু যায় আসে না।”

তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর উদাহরণ টেনে বলেন, ভারত বা পাকিস্তানে যখন কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বা প্রতিরক্ষা উদ্যোগ গৃহীত হয়, সেখানে বাংলাদেশের মতামতের যেমন কোনো আইনি বা কৌশলগত গুরুত্ব থাকে না, তেমনি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে গৃহীত কোনো উদ্যোগেও অন্য দেশের আপত্তির সুযোগ নেই। এটি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকার।

নিচে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির এই অনড় অবস্থানের মূল দিকগুলো তুলে ধরা হলো:

প্রসঙ্গের বিবরণ বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান
সার্বভৌমত্ব জাতীয় স্বার্থে যে কোনো দেশের সাথে অংশীদারিত্ব গড়ার পূর্ণ অধিকার।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ড্রোন বা প্রযুক্তিগত কারখানা স্থাপন নিজস্ব বিষয়।
তৃতীয় পক্ষের প্রভাব অন্য দেশের অসন্তোষ বা নেতিবাচক ধারণাকে গুরুত্ব না দেওয়ার নীতি।
আঞ্চলিক ভারসাম্য প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাংলাদেশ যেমন হস্তক্ষেপ করে না, তেমনি প্রতিদান আশা করে।
উন্নয়ন অংশীদার চীনের সাথে ড্রোন কারখানা স্থাপনকে কেবল একটি কারিগরি ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা।

কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

পররাষ্ট্র উপদেষ্টার এই মন্তব্যকে বিশ্লেষকরা বাংলাদেশের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (Strategic Autonomy) হিসেবে দেখছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্পষ্ট করতে চাইছে যে, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে যে কোনো ধরনের শিল্প বা প্রতিরক্ষা অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে কেবল দেশের প্রয়োজন এবং জনগণের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে। বিশেষ করে আধুনিক যুগে ড্রোনের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনীয়তা এবং কারিগরি সক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে চীন একটি শক্তিশালী অংশীদার হতে পারে।

উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন আরও উল্লেখ করেন যে, একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার সীমান্ত সুরক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য প্রযুক্তিগতভাবে স্বাবলম্বী হতে চায়। এতে কারিগরি সহযোগিতা কে দিচ্ছে, সেটি গৌণ বিষয়; মুখ্য বিষয় হলো বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি। তিনি সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করেন যে, সরকার যে কোনো দেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখেই বাংলাদেশের স্বার্থ সমুন্নত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

উপসংহারে বলা যায়, পররাষ্ট্র উপদেষ্টার এই দৃঢ় অবস্থান বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এটি কেবল চীনের সাথে ড্রোন কারখানার ইস্যু নয়, বরং যে কোনো বিদেশি অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসী ও সার্বভৌম অবস্থানেরই প্রতিফলন।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।