কিছু কিছু নাম শুধু নাম নয়—
একটি সময়ের স্মৃতি, একটি প্রজন্মের ভালো লাগা, একটি কণ্ঠের মায়া, একটি মুখের পরিচিত আলো।
প্রজ্ঞা লাবনী তেমনই একটি নাম।
নামটি উচ্চারণ করলেই মনে পড়ে যায় রেডিওর সেই সোনালি দিনগুলোর কথা। মনে পড়ে রাত নয়টার অপেক্ষা। রেডিও সেটের সামনে বসে থাকা। তারপর হঠাৎ ভেসে আসা দুটি পরিচিত, সুললিত কণ্ঠ—প্রজ্ঞা লাবনী ও শফি কামাল। রেডিও ম্যাগাজিন ‘উত্তরণ’ যেন তখন কেবল একটি অনুষ্ঠান ছিল না; ছিল আমাদের নিত্যদিনের সাংস্কৃতিক জীবনের একটি আবেগ, একটি অপেক্ষা, একটি মুগ্ধতার নাম।
সময়ের স্রোত অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। রেডিওর সেই দিনগুলো অনেক দূরে সরে গেছে। কিন্তু কিছু কণ্ঠ সময়কে অতিক্রম করে মানুষের স্মৃতিতে থেকে যায়। প্রজ্ঞা লাবনীর কণ্ঠ তেমনই একটি কণ্ঠ।
তিনি লেখিকা। তিনি উপস্থাপিকা। তিনি আবৃত্তিশিল্পী। তিনি বেতার ব্যক্তিত্ব। তিনি অভিনেত্রী। শিক্ষক। প্রশিক্ষক। সর্বোপরি তিনি একজন সংস্কৃতিমনস্ক, বহুমাত্রিক ও সৃজনশীল মানুষ।
কী নন তিনি?
শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রায় প্রতিটি অঙ্গনেই তাঁর রয়েছে সাবলীল বিচরণ। কোথাও তিনি আরোপিত নন, কোথাও কৃত্রিম নন—নিজের স্বাভাবিক মেধা, কণ্ঠের মাধুর্য, ব্যক্তিত্বের দীপ্তি আর পরিমিত সৌন্দর্য দিয়েই তিনি তৈরি করেছেন নিজের আলাদা একটি পরিচয়।
আশির দশকের টেলিভিশনেও তাঁর অভিনয় আমাদের মনে দাগ কেটেছে। পরবর্তীকালে ২০০৭ সালে এনামুল করিম নির্ঝরের ‘আহা!’ চলচ্চিত্রে বিশেষ একটি চরিত্রে অভিনয় করে তিনি আবারও দেখিয়েছেন—অভিনয় তাঁর কাছে নিছক উপস্থিতি নয়, চরিত্রকে ধারণ করারও একটি শিল্প।
তাঁর জীবন ও বেড়ে ওঠার পেছনেও রয়েছে এক অসাধারণ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
মা অধ্যাপক, সাহিত্যিক ও প্রয়াত ভাষাসৈনিক হালিমা খাতুন। পিতা ছিলেন একসময় খুলনার জেলা প্রশাসক। পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান প্রজ্ঞা লাবনী। আর অভিনয়জগতের আরেক উজ্জ্বল নক্ষত্র সুবর্ণা মুস্তাফা তাঁর চাচাতো বোন।
অর্থাৎ তাঁর শিকড়েই যেন মিশে আছে শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার।
শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক। হলিক্রস কলেজের শিক্ষার্থী প্রজ্ঞা লাবনী পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করেন। পাশাপাশি অর্থনীতিতে এমবিএ অর্জন করেন। শিক্ষকতা ও প্রশিক্ষণেও রয়েছে তাঁর দীর্ঘ পথচলা।
আইইউবি, এনএসইউ, ড্যাফোডিল, শান্তা মারিয়াম, ইস্ট ওয়েস্ট ও ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন। ২০১০ সাল থেকে তিনি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজির শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
একজন মানুষ একই সঙ্গে শিল্পী, লেখক, উপস্থাপক ও শিক্ষক—এই বহুমাত্রিক পরিচয় খুব সহজে অর্জন করা যায় না। তার জন্য প্রয়োজন মেধা, অধ্যবসায়, শৃঙ্খলা এবং সর্বোপরি নিজের কাজের প্রতি ভালোবাসা। প্রজ্ঞা লাবনীর দীর্ঘ পথচলায় সেই চারটিরই সুন্দর সমন্বয় দেখতে পাই।
ব্যক্তিজীবনেও তাঁর রয়েছে ভালোবাসা ও বেদনার এক সমৃদ্ধ অধ্যায়। এ দেশের প্রখ্যাত আবৃত্তিশিল্পী প্রয়াত কাজী আরিফ ছিলেন তাঁর জীবনসঙ্গী। তাঁদের চার সন্তান—প্রপা, আনুশা, বৃন্ত ও তেপান্তর।
জীবন কখনো শুধু আলো দিয়ে তৈরি হয় না। সেখানে থাকে প্রাপ্তি, অপূর্ণতা, আনন্দ, বেদনা, স্মৃতি আর অতিক্রম করে যাওয়ার সাহস। প্রজ্ঞা লাবনী তাঁর জীবনপথে সেই সবকিছুকেই ধারণ করে আজও নিজের মতো করে এগিয়ে চলেছেন।
আজ ৪ অক্টোবর তাঁর জন্মদিন।
জন্মদিন তাই তাঁর জন্য শুধু একটি তারিখ নয়—এটি তাঁর দীর্ঘ পথচলার দিকে একবার ফিরে তাকানোর দিন। কত মানুষকে তিনি আনন্দ দিয়েছেন, কত শ্রোতার মনে জায়গা করে নিয়েছেন, কত শিক্ষার্থীর কাছে জ্ঞানের আলো পৌঁছে দিয়েছেন, কত দর্শককে তাঁর অভিনয় ও উপস্থাপনায় মুগ্ধ করেছেন—তার হিসাব হয়তো কোনো খাতায় লেখা নেই। কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে তার অনেকটাই রয়ে গেছে।
আর মানুষের ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো অর্জন কি আছে?
প্রজ্ঞা লাবনী একজন নিরহংকার মানুষ। ভ্রমণপিয়াসী। উদারচিত্ত। মানুষের সঙ্গে সহজে মিশে যাওয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা তাঁর। তাঁর ব্যক্তিত্বে তাই একদিকে যেমন রয়েছে বিদ্যার দীপ্তি, অন্যদিকে তেমনি আছে সহজ-সরল মানবিকতার উষ্ণতা।
এই মানুষটির জন্মদিনে তাই শুভেচ্ছা জানানো মানে শুধু একজন প্রিয় মানুষকে শুভেচ্ছা জানানো নয়; আমাদের নিজেদের একটি প্রিয় সময়, একটি প্রিয় কণ্ঠ, একটি মধুর সাংস্কৃতিক স্মৃতিকেও যেন একবার ভালোবাসায় ছুঁয়ে দেখা।
প্রিয় প্রজ্ঞা লাবনী,
আপনার জীবনের আগামী দিনগুলো হোক আরও সুন্দর, আরও নির্মল, আরও সৃষ্টিশীল।
আপনার কণ্ঠে থাকুক আগের মতোই মায়া, কথায় থাকুক প্রজ্ঞা, সৃষ্টিতে থাকুক সৌন্দর্য, আর পথচলায় থাকুক মানুষের ভালোবাসা।
ভালো থাকুন। সুন্দর থাকুন। সুস্থ থাকুন।
জীবনের প্রতিটি নতুন সকাল আপনার জন্য নিয়ে আসুক নতুন আনন্দ; প্রতিটি বিকেল হয়ে উঠুক প্রশান্তির; আর প্রতিটি আগামী দিন আপনার অর্জনের খাতায় যোগ করুক নতুন কোনো সুন্দর অধ্যায়।
শুভ জন্মদিন, প্রজ্ঞা লাবনী।
আপনি শুধু একটি নাম নন—
আপনি আমাদের এক টুকরো মধুর স্মৃতি,
একটি স্নিগ্ধ কণ্ঠের অনুরণন,
একটি সুন্দর সময়ের জীবন্ত ফ্রেম।
আপনার জন্য রইল অফুরান ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও শুভকামনা।
জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা।


