‘আমার বাচ্চা ফেরত দেন’—একমাত্র সন্তান হারিয়ে বাবার আহাজারি

‘আমার বাচ্চা ফেরত দেন, আর কিছু লাগবে না।’ একমাত্র সন্তান আভানকে হারিয়ে এভাবেই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন বাবা মৃদুল ইসলাম। চার বছর ছয় মাস বয়সী শিশুটির মৃত্যু হয়েছে রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। শনিবার (৩ অক্টোবর) বিকেল ৫টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

পরিবারের অভিযোগ, ভুল চিকিৎসা, অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনুপস্থিতি এবং চিকিৎসায় অবহেলার কারণে আভানের মৃত্যু হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

আভানের বাবা মৃদুল ইসলাম একজন গণমাধ্যমকর্মী। সন্তানকে হারানোর পর তিনি বলেন, ‘আমার বাচ্চা সুস্থ বাচ্চা, হেঁটে হেঁটে হাসপাতালে এসেছে। আমার বাচ্চা ফেরত দেন, আর কিছু লাগবে না।’ কথা বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তিনি।

পরিবারের সদস্যরা জানান, আভান ছিল মৃদুল ইসলামের একমাত্র সন্তান। বাবার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। মৃদুল সব সময় সন্তানকে নিজের কাছেই রাখতেন এবং সুযোগ পেলেই তাকে নিয়ে ঘুরতে বের হতেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২৮ সেপ্টেম্বর জ্বর ও পেটে ব্যথা নিয়ে আভানকে ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা ডেঙ্গু সন্দেহে তার চিকিৎসা শুরু করেন। পরিবারের দাবি, হাসপাতালে একাধিকবার ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হলেও প্রতিবারই ফল নেগেটিভ আসে। এরপরও ডেঙ্গুকে বিবেচনায় রেখেই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ স্বজনদের।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় আভান স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়া করছিল বলেও দাবি করেছে পরিবার। বাসা থেকে পরিবারের সদস্যরা তার জন্য খাবার নিয়ে যেতেন। এমনকি হাসপাতালে থাকা অবস্থায় শিশুটি বাবাকে ফোন করে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছিল বলে জানান মৃদুল ইসলাম।

তবে ২ অক্টোবর পরিস্থিতি বদলে যায়। ওই দিন আভানকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। পরিবারের অভিযোগ, আইসিইউতে নেওয়ার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সরাসরি উপস্থিত ছিলেন না। টেলিফোনে দেওয়া নির্দেশনার ভিত্তিতে চিকিৎসা চলছিল বলে দাবি স্বজনদের।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, আভানের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের আশ্বস্ত করেছিল। তাদের বলা হয়েছিল, শিশুটির অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু পরদিন শনিবার বিকেলে হঠাৎ তার মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়।

শিশুটির মৃত্যুর পর চিকিৎসার ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিবার। তাদের অভিযোগ, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আভানকে অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছিল। এরপর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং ‘শক সিনড্রোম’ দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত এ অবস্থাতেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি স্বজনদের।

পরিবার আরও অভিযোগ করেছে, চিকিৎসার কেস সামারিসহ প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল নথি পেতেও শুরুতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে যথাযথ সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। পরে তারা প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করেন।

স্বজনদের দাবি, ওই মেডিক্যাল নথিতে শিশুটির রক্তে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন এবং শক সিনড্রোমের তথ্য উল্লেখ রয়েছে। এসব নথি সামনে রেখে চিকিৎসায় কোনো ভুল বা অবহেলা হয়েছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছে পরিবার।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোনো শিশুর মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে শুধু একটি উপসর্গ, ওষুধের ব্যবহার কিংবা একটি পরীক্ষার ফল যথেষ্ট নয়। রোগীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসার ইতিহাস, পরীক্ষার ফল, ওষুধের মাত্রা, চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত এবং মৃত্যুর আগে শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন—সবকিছু পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাই পরিবারের অভিযোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মেডিক্যাল রেকর্ড ও চিকিৎসকদের বক্তব্যও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে আভানের পরিবার। তাদের দাবি, শিশুটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে এবং চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

এদিকে আভানের মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন স্বজনরা। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পুরো পরিবার এখন শোকে মুহ্যমান। যে শিশুকে কয়েক দিন আগেও সুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তার মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফেরার দৃশ্য পরিবারটির জন্য আরও বেদনাবিধুর হয়ে উঠেছে।

আভানের বাবার আকুতি এখন একটাই—সন্তানকে আর ফিরে পাওয়ার সুযোগ নেই, অন্তত তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ যেন জানা যায়। পরিবারের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপই এখন তাদের প্রধান দাবি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।