ইউনূস সরকারের লুটপাটের চিত্র ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল নিয়ে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থপাচারের নানা অভিযোগ সামনে আসছে। বিশেষ করে সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, কর্মকর্তা এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়া অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবকটির সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি। দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর বাস্তবতা যাচাই হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের সময়কালে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রায় দুই হাজার অভিযোগ দুদকের কাছে জমা পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ ও বদলিতে অনিয়ম এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো গুরুতর বিষয় রয়েছে। দুদক এসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী অনুসন্ধান বা তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

এরই মধ্যে সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের অর্থের দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত শুরুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখার মতো অভিযোগও রয়েছে। আরও দাবি করা হয়েছে, দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে বিপুল অর্থ পাচার করা হয়েছে।

তবে এসব অর্থের পরিমাণ, উৎস এবং পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে তদন্ত শেষ হওয়া জরুরি। অভিযোগে যেসব অঙ্ক উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোকে বর্তমানে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধেও বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ জমা পড়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিচারক, আইন কর্মকর্তা ও সাব-রেজিস্ট্রার নিয়োগ এবং বদলির ক্ষেত্রে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটেছে। জামিন ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমেও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁর নামে সুইস ব্যাংক হিসাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও ফ্লোরিডায় সম্পদ থাকার দাবিও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দাবির সত্যতা যাচাইয়ের বিষয়টি তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।

সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধেও হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তাঁর স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীর মাধ্যমে দুবাই ও লন্ডনে সম্পদ বা ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগও তোলা হয়েছে। একইভাবে সাবেক উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমের ঘনিষ্ঠ স্বজনের নামে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে সম্পত্তি কেনার অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়েছে, প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্তর্বর্তী সরকারের অধিকাংশ উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই কোনো না কোনো অভিযোগ দুদকে জমা পড়েছে। সব মিলিয়ে অভিযোগের আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এই অঙ্কের অর্থ বাস্তবে আত্মসাৎ বা পাচার হয়েছে কি না, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

অর্থপাচার নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের তথ্যও সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ থাকলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। তবে কোনো দেশের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের মোট আমানত বাড়ার অর্থ সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সরকারের সঙ্গে যুক্ত—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট হিসাব ও অর্থের উৎস আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

দুদকের কাছে জমা পড়া অভিযোগের সংখ্যা বা আর্থিক অঙ্ক বড় হলেও প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। অভিযোগ, প্রাথমিক অনুসন্ধান এবং আনুষ্ঠানিক তদন্ত—এই তিনটি বিষয় এক নয়। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়া মানেই তিনি দুর্নীতির জন্য দায়ী, এমনটি বলা যায় না। তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলে তবেই আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

ইউনূস সরকারের সময়কার কর্মকাণ্ড নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কও রয়েছে। সরকারের সমর্থক ও সমালোচকদের মধ্যে এ সময়ের শাসনব্যবস্থা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভিন্নমত দেখা গেছে। দুর্নীতির অভিযোগগুলো সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।

এ অবস্থায় দুদকের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষতা ও প্রমাণের ভিত্তি যাচাই করা। কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী, সরকারের অংশ ছিলেন বা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত—এমন পরিচয় তদন্তের ফল নির্ধারণের কারণ হওয়া উচিত নয়। একইভাবে অভিযোগকারী বা অভিযুক্ত—কোনো পক্ষের বক্তব্যের ওপর একমাত্র নির্ভর না করে নথি, ব্যাংক হিসাব, সম্পদের বিবরণ, আর্থিক লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রমাণ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

দেশের মানুষের প্রত্যাশা, দুর্নীতির অভিযোগে যার বিরুদ্ধেই অভিযোগ থাকুক না কেন, তার বিরুদ্ধে একই মানদণ্ডে তদন্ত পরিচালিত হবে। অভিযোগের সত্যতা থাকলে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও তা পরিষ্কারভাবে জানার সুযোগ দেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত একটি নিরপেক্ষ, প্রমাণভিত্তিক ও স্বচ্ছ তদন্তই ইউনূস সরকারের সময়কার দুর্নীতি ও অর্থপাচার নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রকৃত চিত্র সামনে আনতে পারে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।