কলকাতার মঞ্চে মেঘদল। আকাশে মেঘের ভেসে চলার মতোই সুরের আবহ তৈরি করে একের পর এক গান পরিবেশন করল বাংলাদেশের ব্যান্ডটি। ‘এসো আমার শহরে’, ‘বনবিবি’ ও ‘এ হাওয়া’সহ জনপ্রিয় কয়েকটি গান শুনিয়ে কলকাতার শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন মেঘদলের শিল্পীরা। গত ৫ সেপ্টেম্বর কলকাতার জি ডি বিড়লা সভাঘরে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বাংলাদেশের মেঘদল ও পশ্চিমবঙ্গের চন্দ্রবিন্দুর প্রথমবার একই মঞ্চে গান পরিবেশন।
‘মেঘের সঙ্গে চাঁদের দেখা’ শিরোনামের এই কনসার্টে দুই বাংলার দুই প্রজন্মের শ্রোতা-শিল্পীর মধ্যে তৈরি হয় এক বিশেষ সাংস্কৃতিক সংযোগ। আয়োজনে ছিল জেন নেক্সট গ্রুপ, চিলেকোঠা ও ট্যালেন্টওয়ালা।
মেঘদলের পরিবেশনার সময় তরুণ শ্রোতাদের অনেকেই গানের তালে নেচেছেন, কেউ গলা মিলিয়েছেন, আবার কেউ নীরবে নিজেদের মতো করে উপভোগ করেছেন গান। তবে অনুষ্ঠানটি শুধু তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন বয়সী শ্রোতাই মেঘদলের গানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ব্যান্ডটির সংগীতের কথামুখী আবহ, ভিন্নধর্মী সুর এবং স্থানীয় জীবন ও ইতিহাস থেকে উঠে আসা নানা অনুষঙ্গ কলকাতার শ্রোতাদের কাছেও আলাদা আবেদন তৈরি করে।
একই মঞ্চে মেঘদল ও চন্দ্রবিন্দু
কনসার্টের বিশেষ মুহূর্ত আসে চন্দ্রবিন্দুর পরিবেশনার সময়। ‘মন’, ‘গীতগোবিন্দ’ ও ‘এভাবেও ফিরে আসা যায়’সহ নিজেদের জনপ্রিয় গান পরিবেশন করে কলকাতার এই ব্যান্ড। এরপর অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে মঞ্চে একসঙ্গে ওঠে মেঘদল ও চন্দ্রবিন্দু।
দুই ব্যান্ডের শিল্পীরা একসঙ্গে গেয়ে ওঠেন ‘বন্ধু চল’। তখন মঞ্চে বাংলাদেশের মেঘদল কিংবা কলকাতার চন্দ্রবিন্দু—দুটি আলাদা পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে দুই বাংলার শিল্পীদের সম্মিলিত সংগীত। দর্শকদের উচ্ছ্বাসও ছিল সেই মুহূর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কলকাতা থেকে ফেরার পথে মেঘদলের সদস্য শিবু কুমার শীল জানান, কলেজজীবনে তাঁরা চন্দ্রবিন্দুর গান নিয়মিত শুনতেন। তাঁদের কাছে এই ব্যান্ড ছিল এক ধরনের অনুপ্রেরণা। ফলে যাদের গান একসময় শ্রোতা হিসেবে শুনেছেন, তাঁদের সঙ্গে একই মঞ্চে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল বিশেষ আবেগের।
শিবুর ভাবনায়, রাজনীতি ও নানা ধরনের অস্থিরতা যখন মানুষের মধ্যে বিভাজন ও ঘৃণা বাড়িয়ে দেয়, তখন সংগীত মানুষের মধ্যে সুস্থতা ও সংযোগ ফিরিয়ে আনার শক্তি রাখে। কলকাতার এই আয়োজন যেন সেই ভাবনারই একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছিল।
গান থেকে দেখা কলকাতা
মেঘদলের কলকাতা সফর কেবল মঞ্চের অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্যান্ডের সদস্যরা ঘুরে দেখেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ও। সাহিত্য, গান ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে যে কলকাতাকে তাঁরা এত দিন চিনেছেন, এবার সেই শহরকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন।
একজন সংগীতশিল্পীর কাছে কোনো শহর শুধু রাস্তা, ভবন কিংবা দর্শনীয় স্থানের সমষ্টি নয়। সেই শহরের সাহিত্য, সংগীত, মানুষের জীবনযাপন ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসও তার পরিচয়ের অংশ। মেঘদলের এই সফরে সেই কলকাতার সঙ্গেও নতুন করে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
‘মুল্লুক’-এ ইতিহাসের কাছে ফেরা
মেঘদলের সাম্প্রতিক কাজের মধ্যে ‘মুল্লুক’ গানটি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। ২০ আগস্ট কোক স্টুডিও বাংলার আয়োজনে গানটি প্রকাশের পর অল্প সময়ের মধ্যেই এর ভিডিও ৩৩ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে।
গানটির আবেদন শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভারতের আসাম থেকেও শ্রোতারা গানটি শুনে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সুবহান আলী নামের এক শ্রোতা গানটির সুর, কথা ও অনুভূতির প্রশংসা করে মন্তব্য করেন, দেশ আলাদা হলেও ভালো গান ও সুন্দর অনুভূতির কোনো সীমান্ত নেই।
‘মুল্লুক’ তৈরির পেছনে রয়েছে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কোক স্টুডিও বাংলার তথ্য অনুযায়ী, ‘পিঞ্জরাকে পুষল ময়না’ গানের পঙ্ক্তি ও সুরের ভিত্তিতে নতুনভাবে গানটি তৈরি করা হয়েছে। শতবর্ষ আগে চা-শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম এবং ঐতিহাসিক ‘মুল্লুক চলো আন্দোলন’ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে মেঘদল গানটিকে নতুন সংগীতভাষায় উপস্থাপন করেছে।
গানটিতে মেঘদলের সঙ্গে কণ্ঠ দিয়েছেন চা-শিল্পী রনজু তাঁতি ও রঞ্জিত তাঁতি। ফলে গানটি শুধু একটি আধুনিক ব্যান্ডের পরিবেশনা হয়ে থাকেনি; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি দীর্ঘ সামাজিক ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার স্মৃতি।
‘মুল্লুক’-এর সঙ্গে মেঘদলের পরিচয়ও এসেছে পুরোনো একটি সূত্র ধরে। ২০০৪ সালে তারেক মাসুদের ‘অন্তর্যাত্রা’ সিনেমায় চা-বাগানের একটি গানের ছোট অংশ ব্যবহৃত হয়েছিল। পরে সংগীতশিল্পী মৌসুমী ভৌমিকের কাছ থেকে গানটির বিষয়ে জানতে পারেন মেঘদলের সদস্যরা।
গানটি শোনার পরই সেটির উৎস অনুসন্ধানের আগ্রহ তৈরি হয় ব্যান্ডটির মধ্যে। কোথা থেকে গানটি এসেছে, কারা এটি গেয়েছেন এবং এর সঙ্গে যুক্ত মানুষ কারা—এসব জানতে তাঁরা খোঁজ শুরু করেন। শুধু পুরোনো রেকর্ড সংগ্রহ করেই থেমে থাকেননি; গানটির সঙ্গে যুক্ত শিল্পী ও মানুষের কাছেও পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন। সেই সূত্র ধরেই সংশ্লিষ্ট শিল্পীদের খুঁজে বের করে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পরে রেকর্ড করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
জনপ্রিয়তার চেয়ে শিকড়কে গুরুত্ব
মেঘদলের সংগীতভাবনায় স্থানীয় সংস্কৃতি, মানুষের জীবন ও ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। ব্যান্ডটির লক্ষ্য শুধু সহজে জনপ্রিয় হওয়া নয়। বরং গানের ভাবনা, নিজস্ব সংগীতভাষা এবং সেই গানের শিকড়কে গুরুত্ব দিয়েই কাজ করতে চায় তারা।
এই অবস্থানই মেঘদলের সংগীতকে আলাদা করে তুলেছে। সমসাময়িক শ্রোতার কাছে পৌঁছানোর পাশাপাশি নিজেদের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা ও সৃষ্টিশীল অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা রয়েছে ব্যান্ডটির কাজে। ‘মুল্লুক’ সেই চেষ্টার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
সামনে নতুন গান ও নতুন আয়োজন
কলকাতা সফরের পরও ব্যস্ত সময় পার করছে মেঘদল। সামনে নতুন কয়েকটি গান প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে শিবু কুমার শীলের গাওয়া ‘কার্নিভ্যাল’ এবং মেজবাউর রহমান সুমনের ‘তারে কোথায় খুঁজে পাই’, ‘বাঘ’সহ কয়েকটি গান নিয়ে কাজ চলছে। রেকর্ডিংয়ের কাজও এগিয়েছে।
এবার স্টুডিও রেকর্ডিংয়ের পাশাপাশি কিছু গান লাইভ রেকর্ড করার পরিকল্পনাও রয়েছে ব্যান্ডটির। একই গানকে ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করার চেষ্টা থাকবে বলে জানিয়েছেন শিবু কুমার শীল। অর্থাৎ পুরোনো সৃষ্টিকে শুধু পুনরাবৃত্তি নয়, নতুন সংগীত বিন্যাস ও পরিবেশনার মাধ্যমে শ্রোতার সামনে তুলে ধরার ভাবনাও রয়েছে তাঁদের।
এরই মধ্যে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর কাভিশের সঙ্গে মেঘদলের একটি শো করার কথা রয়েছে। ফলে কলকাতার মঞ্চে দুই বাংলার শিল্পীদের সঙ্গে সংগীতের যে সেতুবন্ধ তৈরি হয়েছে, তার পরেও নিজেদের নতুন গান ও নতুন পরিবেশনা নিয়ে এগিয়ে যেতে চাইছে মেঘদল।
মেঘদলের সাম্প্রতিক পথচলায় তাই একদিকে যেমন রয়েছে নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে নিজেদের শিকড়ের দিকে ফিরে তাকানোর প্রবণতা। কলকাতার ‘মেঘের সঙ্গে চাঁদের দেখা’ সেই যাত্রায় আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকল।


