নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় এক স্কুলছাত্রীকে দীর্ঘদিন ধরে ধর্ষণ, নির্যাতন এবং ঘটনার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম ভূঞা বকুলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বকুলকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী কিশোরীর বাবা গত মঙ্গলবার গভীর রাতে কেন্দুয়া থানায় মামলা করেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে করা মামলায় বকুলসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও তিন থেকে চারজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ভুক্তভোগী বর্তমানে দশম শ্রেণির ছাত্রী। প্রায় চার বছর আগে তিনি কেন্দুয়া সাবেরুন্নেছা বালিকা বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় যৌন নির্যাতনের শিকার হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি বকুল ওই কিশোরীর আত্মীয় এবং সম্পর্কে তার খালু।
এজাহারে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে কিশোরীকে একটি বাড়িতে নিয়ে যান বকুল। সেখানে তাকে ধর্ষণ করা হয় এবং সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে কিশোরীকে বিভিন্ন স্থানে এবং বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে বাধ্য করা হতো বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। এ কাজে আরও কয়েকজন সহযোগী জড়িত ছিলেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্প্রতি কিশোরী এ ধরনের কর্মকাণ্ডে যেতে অস্বীকৃতি জানালে আগে ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় পরিবারটি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেয়।
মামলায় বকুল ছাড়াও আবু মিয়া, বকুলের মেয়ে মোছা. লিমা, স্ত্রী মোছা. জাহানারা বেগম এবং মোছা. স্মৃতিকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার এজাহারভুক্ত দ্বিতীয় আসামি আবু মিয়া, বয়স ৩৫,কে মঙ্গলবার রাত প্রায় ৩টার দিকে কেন্দুয়া পৌরসভার সাউদপাড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বুধবার বিকেলে তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি বকুল মিয়া, বয়স ৫০, এখনও পলাতক রয়েছেন। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অভিযুক্ত বকুল কেন্দুয়া পৌর বিএনপির সহসাধারণ সম্পাদক এবং পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
ঘটনার পর বুধবার রাতে কেন্দুয়া পৌর বিএনপির সভাপতি খোকন আহম্মেদ ডিলার এবং সাধারণ সম্পাদক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন খানের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বকুলকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলের সব পর্যায়ের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা বলা হয়।
কেন্দুয়া পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন খান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তিনি প্রথম বিষয়টি জানতে পারেন। পরে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বকুলের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম জানান, মামলার একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এ ধরনের মামলায় অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী কিশোরীর নিরাপত্তা, মানসিক সহায়তা এবং তার ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে যৌন নির্যাতনের ঘটনায় ধারণ করা কোনো ভিডিও বা ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে পড়লে ভুক্তভোগীর ওপর নতুন করে সামাজিক ও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবাইকে ভুক্তভোগীর পরিচয় ও ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষায় সতর্ক থাকা প্রয়োজন।


