বুধবার (২১ অক্টোবর) রাতে উপজেলার গফরগাঁও ইউনিয়নের হাতিখলা গ্রাম থেকে নাদিয়ার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি উপজেলার লংগাইর ইউনিয়নের বাগবাড়ি গ্রামের নাজিম উদ্দিনের মেয়ে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক বছর আগে হাতিখলা গ্রামের নূর চানের ছেলে কাওছার মিয়ার সঙ্গে পারিবারিকভাবে নাদিয়ার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই স্বামীর বাড়িতে নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছিলেন তিনি। স্বজনদের অভিযোগ, স্বামী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা নাদিয়ার ওপর নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন।
নির্যাতনের বিষয়টি নাদিয়া একাধিকবার মা-বাবাকে জানিয়েছিলেন। তবে মেয়ের সংসার টিকিয়ে রাখার কথা ভেবে তাঁরা তাঁকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিতেন। এর মধ্যেই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন নাদিয়া। কিন্তু বিয়ের এক বছরের মধ্যেই তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় শোকাহত হয়ে পড়েছে পরিবার।
নিহত নাদিয়ার মা ময়ফুল বানু জানান, বুধবার দুপুরেও মেয়ের সঙ্গে তাঁর মুঠোফোনে কথা হয়েছিল। ওই সময় নাদিয়া জানিয়েছিলেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি বাবার বাড়িতে আসবেন। কিন্তু সেই অপেক্ষা আর শেষ হয়নি। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামলেও মেয়ে বাড়িতে ফেরেননি।
রাত ৮টার দিকে কাওছার মিয়ার এক আত্মীয় ফোন করে নাদিয়ার মৃত্যুর খবর জানান। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত হাতিখলা গ্রামে ছুটে যান। রাত ৯টার দিকে শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে তাঁরা নাদিয়ার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ময়ফুল বানু বলেন, ‘বুধবার দুপুরে নাদিয়া ফোন করে আমাকে জানিয়েছিল, সে কিছুক্ষণ পর আমাদের বাড়িতে আসবে। রাত ৮টার দিকে জামাই কাওছারের এক আত্মীয় ফোন করে নাদিয়া মারা গেছে বলে খবর দেয়। রাত ৯টার দিকে আমরা গিয়ে শ্বশুরবাড়িতে নাদিয়ার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখি। সে সময় বাড়িতে অসংখ্য মানুষের ভিড় থাকলেও মেয়ে জামাই বা তার পরিবারের কোনো সদস্যকে দেখা যায়নি।’
মেয়ের এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না ময়ফুল বানু। তাঁর অভিযোগ, নাদিয়াকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার পর স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের অনুপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
ময়ফুল বানু বলেন, ‘আমার মেয়ে তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। তাকে যদি হত্যাই না করা হয়ে থাকে, তবে মেয়ে জামাইসহ বাড়ির অন্য সবাই কেন মরদেহ ফেলে পালিয়ে গেল? আমরা এই হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার চাই।’
নাদিয়ার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার অভিযোগ করা হলেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত এটি হত্যা, নাকি অন্য কোনো কারণে মৃত্যু, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
এদিকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন গফরগাঁও থানার পরিদর্শক মশিউর রহমান। তিনি জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নাদিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। পরে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, নাদিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর মা ময়ফুল বেগম বাদী হয়ে থানায় অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে তাঁদের অবস্থান কিংবা গ্রেপ্তারের বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
নাদিয়ার মৃত্যুর আগে তাঁর ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল কি না, পরিবারের তোলা হত্যার অভিযোগের সত্যতা কতটুকু এবং মৃত্যুর পর স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা কেন অনুপস্থিত ছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
নিহতের স্বজনেরা ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নাদিয়ার মৃত্যুর পেছনে কারও অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাঁদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন তাঁরা।


