জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলায় চাঁদা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সংলগ্ন বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। শনিবার দুপুরে উপজেলার কৃষ্ণকোলা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আল আমিনের দাবি, একটি চুরি যাওয়া ইজিবাইকের যন্ত্রাংশ কেনাবেচার অভিযোগ তুলে কয়েক শ মানুষ তাঁর দোকান ও বাড়িতে হামলা চালান। এ সময় নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করা হয়েছে।
ঘটনার পর রোববার দুপুরে আক্কেলপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন আল আমিন। তাঁর অভিযোগে ৭ লাখ টাকা নগদ লুট এবং প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরে তিনি বলেন, বাড়িতে থাকা নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও দোকানের মালামাল মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।
আক্কেলপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহীন রেজা জানান, ঘটনার পর তিনি রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, চোরাই ইজিবাইকের মালামাল কেনাবেচার অভিযোগকে কেন্দ্র করে একদল লোক জড়ো হয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করেছে। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে।
ঘটনার সূত্রপাত একটি ইজিবাইক চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে। উপজেলার বুড়াপুকুর-বিষ্ণপুর গ্রামের সাগর হোসেন কয়েক মাস আগে ৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি ইজিবাইক কিনেছিলেন। গত ৯ আগস্ট রাতে তাঁর বাড়ি থেকে সেটি চুরি হয়। পরে তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। তবে এখন পর্যন্ত ইজিবাইকটি উদ্ধার হয়নি।
গত শুক্রবার রাতে বুড়াপুকুর এলাকায় চারজনকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের ধাওয়া করলে তিনজনকে আটক করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, চারদীঘি গ্রামের রাজু ওই তিনজনকে রাতে মারধর করেন। পরদিন শনিবার বুড়াপুকুর গ্রামের একটি মসজিদের পাশে ফাঁকা জায়গায় স্থানীয়ভাবে সালিস বসানো হয়। সেখানে শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
সালিসে আটক তিনজন ইজিবাইক চুরির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন এবং ইজিবাইকটি কৃষ্ণকোলা গ্রামের একটি দোকানে বিক্রি করেছেন বলে জানিয়েছেন—এমন দাবি করা হয়। সালিসের একটি ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে আটক ব্যক্তিদের বক্তব্য বা চুরির অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
এরপর রাজুর নেতৃত্বে আটক তিনজনকে কৃষ্ণকোলা গ্রামের ‘ভাই-ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ ও মেশিনারিজ’ নামের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে বুড়াপুকুর, বিষ্ণপুর ও চারদীঘি গ্রামের কয়েক শ মানুষ জড়ো হন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং দোকান ও পাশের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেন আল আমিন।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আটক তিন সন্দেহভাজনকে থানায় নিয়ে যায়। শনিবার বিকেলে তাঁদের ১৫১ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। পরে তাঁরা জামিনে মুক্তি পান।
আল আমিনের দাবি, প্রায় ১২ বছর ধরে তিনি ও তাঁর ভাই এলাকায় ব্যবসা করে আসছেন। তাঁর অভিযোগ, প্রায় এক মাস আগে চারদীঘি গ্রামের রাজু কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে পিকনিকে যাওয়ার কথা বলে তাঁদের কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
আল আমিন বলেন, ইজিবাইকের যন্ত্রাংশ চুরির অভিযোগকে সামনে রেখে পরিকল্পিতভাবে তাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে। তাঁর দাবি, হামলার সময় বাড়ি থেকে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার এবং দোকানের যন্ত্রাংশসহ বিপুল পরিমাণ মালামাল নিয়ে যাওয়া হয়।
তবে চাঁদা দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রাজু। তাঁর ভাষ্য, আটক তিন ব্যক্তি ইজিবাইক চুরির কথা স্বীকার করায় তাঁদের নিয়ে তিনি পুলিশের সঙ্গে ওই দোকানে গিয়েছিলেন। সেখানে কোনো হামলা, ভাঙচুর বা লুটপাট হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে আল আমিন ও তাঁর ভাই আজাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চোরাই ইজিবাইক ও যন্ত্রাংশ কেনাবেচার অভিযোগ করেন রাজু।
রাজুর এ অভিযোগও অস্বীকার করেছেন আল আমিন। তাঁর দাবি, তাঁরা বৈধভাবে ব্যবসা করেন এবং কোনো চোরাই ইজিবাইক বা যন্ত্রাংশ কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত নন।
ঘটনাটি ঘিরে এখন দুটি পৃথক অভিযোগ সামনে এসেছে—একদিকে চুরি যাওয়া ইজিবাইক ও এর যন্ত্রাংশের বিষয়ে অভিযোগ, অন্যদিকে চাঁদা দাবি, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ। ফলে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণে পুলিশি তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয়ভাবে সালিস করে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের মারধর ও পরে দলবদ্ধভাবে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।


