কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলায় বৃষ্টি (২৫) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে স্বামীর শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগের মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত স্বামী সুমন পলাতক রয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁর পরিবারের সদস্যরাও বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে পুলিশ।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার নাজিরপুর গ্রামের পূর্বপাড়ায় সিরাজ মাস্টারের বাড়িতে সুমনের ঘর থেকে বৃষ্টির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে চান্দিনা থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় গৃহবধূর মৃত্যুর পেছনে নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এলেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নিহত বৃষ্টি পাশের দাউদকান্দি উপজেলার টামটা গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর স্বামী সুমন চান্দিনার নাজিরপুর পূর্বপাড়ার সিরাজ মাস্টারের বাড়ির মনা মিয়ার ছেলে।
দীর্ঘদিন নির্যাতনের অভিযোগ
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিয়ের পর থেকেই বৃষ্টির ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো। স্বামী সুমন প্রায়ই তাঁকে মারধর করতেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। সজিব, সাইফুল ইসলাম ও গিয়াসউদ্দিন নামের তিন বাসিন্দার দাবি, ঘটনার আগে টানা সাত দিন বৃষ্টিকে নির্যাতন করা হয়েছিল।
তাঁদের অভিযোগ, গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে বৃষ্টিকে মারধরের একপর্যায়ে তাঁর গলায় ওড়না পেঁচিয়ে পুকুরপাড় দিয়ে টেনেহিঁচড়ে বাড়িতে নিয়ে যান সুমন। এ সময় কী পরিস্থিতিতে বৃষ্টির শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছিল, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে স্থানীয়দের দাবি, ওই ঘটনার পর থেকেই তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, শনিবার সন্ধ্যার দিকে বৃষ্টিকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে একটি রিকশায় করে তাঁকে আবার বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। তখন তাঁর শরীরে কোনো সাড়া ছিল না বলে দাবি করেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। এ ঘটনার পরপরই সুমন বাড়ি ছেড়ে চলে যান বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
রিকশা থেকে নামানোর সময় সাড়া ছিল না
পাশের বাড়ির বাসিন্দা সালেকা ও জয়নব বিবি জানান, শনিবার রাতে সুমন যখন রিকশায় করে বৃষ্টিকে বাড়িতে নিয়ে আসেন, তখন তাঁরা সহযোগিতা করতে এগিয়ে যান। বৃষ্টিকে রিকশা থেকে নামানোর সময় তাঁর শরীরে কোনো নড়াচড়া দেখতে পাননি তাঁরা। তাঁদের দাবি, সে সময় বৃষ্টির শ্বাস-প্রশ্বাসও ছিল না বলে মনে হয়েছিল।
স্থানীয় দুই নারীর ভাষ্য অনুযায়ী, বৃষ্টির শারীরিক অবস্থা দেখে তাঁরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এ সময় সুমন চিৎকার করে বাড়ি থেকে চলে যান। পরে বৃষ্টির মৃত্যু হয়েছে বলে তাঁরা নিশ্চিত হন।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের এসব বক্তব্য ও অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত সুমনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশি তদন্ত এবং ময়নাতদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।
ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে মরদেহ
চান্দিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুজ্জামান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধার করেছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণের জন্য মরদেহ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ওসি আরও জানান, নিহতের স্বজনেরা এ ঘটনায় মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত স্বামী সুমন পলাতক রয়েছেন। বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তের অপেক্ষায়
বৃষ্টির মৃত্যুর ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্বজন ও স্থানীয়দের অভিযোগের পাশাপাশি ঘটনার আগে ও পরে কী ঘটেছিল, তা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে, বৃষ্টিকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল কি না, তাঁর শারীরিক অবস্থা তখন কেমন ছিল এবং কী পরিস্থিতিতে তাঁকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়—এসব বিষয় তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন থেকে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আলামত যাচাই করে পুলিশকে ঘটনার ধারাবাহিকতা নির্ধারণ করতে হবে।
নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, নির্যাতনের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ ঘটনায় কারও দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হওয়ার আগে তদন্তের ফলাফল ও প্রাসঙ্গিক প্রমাণ বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
এখন বৃষ্টির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং অভিযুক্ত স্বামীকে আইনের আওতায় আনার বিষয়টি তদন্তের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হলে অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।


