ছেলেকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার মাত্র ৫০ দিনের মাথায় এবার বাবার প্রাণ কাড়ল দুর্বৃত্তরা। জীবনের চরম ঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে ১৫ দিন আগে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেও শেষরক্ষা হলো না আক্তার ঢালীর (৫৫)। সোমবার (৫ অক্টোবর ২০২৬) সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে খুলনার রূপসা উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের দুর্জনীমহল গ্রামে তাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
নিহত আক্তার ঢালী দুর্জনীমহল এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। তার মর্মান্তিক এই মৃত্যুর খবরে পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মাধ্যমে জানা যায়, প্রতিদিনের অভ্যাস অনুযায়ী সোমবার মাগরিবের নামাজ শেষে মসজিদের কাছেই একটি চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন আক্তার ঢালী। এমন সময় হঠাৎ গুলির শব্দে চারপাশ কেঁপে ওঠে। উপস্থিত লোকজন ছোটাছুটি শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা এগিয়ে গিয়ে দেখতে পান, আক্তার ঢালী চায়ের দোকানের বেঞ্চের পাশে মাটিতে উপুড় হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। দ্রুত তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই হত্যাকাণ্ডের ঠিক ৫০ দিন আগে, গত ১৫ আগস্ট সন্ধ্যায় দুর্জনীমহল এলাকার শহীদের মোড়ে আক্তার ঢালীর ২৫ বছর বয়সী ছেলে জয় ঢালীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করেছিল দুর্বৃত্তরা। সেই ঘটনায় নিহতের মা নাসিমা বেগম বাদী হয়ে ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে রূপসা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন।
ছেলে হত্যার বিচারের জন্য লড়াই করতে গিয়েই নিজের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছিল আক্তার ঢালীর। জানা যায়, হত্যা মামলার আসামিরা উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে এলাকায় ফিরে আসে। এরপর থেকে মামলাটি তুলে নেওয়ার জন্য আক্তার ঢালী ও তার পরিবারের ওপর প্রতিনিয়ত চাপ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন শুরু করে।
হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে গত ২১ সেপ্টেম্বর রূপসা থানায় একটি জিডি করেছিলেন আক্তার ঢালী। জিডিতে তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেন, গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ৯টার দিকে সেনেরবাজার এলাকায় ছেলে হত্যা মামলার আসামি মুনজিল শেখ, মুরাদ শেখ, মাসুদ মোল্যা ও রোপা মোল্যা তাকে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে মামলা প্রত্যাহার না করলে প্রাণনাশের সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়। কোনো উপায় না দেখে আক্তার ঢালী জিডিতে লিখেছিলেন, আসামিরা হাইকোর্ট থেকে জামিনে এসে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য পরিবারটিকে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ফেলেছে এবং তারা জানমালের বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে।
রূপসা থানা পুলিশ সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, আবেদন করার দুদিন পর গত ২৩ সেপ্টেম্বর জিডিটি আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করা হয় (জিডি নং-১৪১২, তারিখ: ২৩/০৯/২৬)। তবে পুলিশে লিখিত অভিযোগ জানানোর পরেও কোনো কার্যকর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার জাহিদ জানান, দুর্বৃত্তদের ছোড়া গুলিতে আক্তার ঢালী মারা গেছেন। পুলিশের একটি চৌকস দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ঠিক কী কারণে এবং কারা এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছে, তা অনুসন্ধানে পুলিশ মাঠে নেমেছে। মূল অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের মুখোমুখি করার চেষ্টা চলছে।


