রাজধানী ঢাকা জুড়ে হঠাৎ তীব্র গ্যাস সংকটে তীব্র চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বিভিন্ন যানবাহনের চালক ও সাধারণ যাত্রীরা। দিন বা রাত—কোনো সময়েই স্বস্তি মিলছে না সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও চাহিদামতো মিলছে না চাপ। অনেক স্টেশন ঘুরে শেষমেশ মিলছে আংশিক গ্যাস। ফলে দিনের বড় একটি অংশ পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে নষ্ট হওয়ায় একদিকে যেমন চালকদের কর্মঘণ্টা ও দৈনিক আয় আশঙ্কাজনক হারে কমছে, অন্যদিকে সড়কগুলোতে যাত্রী ও ব্যক্তিগত গাড়ির সংকট দেখা দিচ্ছে।
রাজধানীর মগবাজার, হাজীপাড়া, বেইলি রোড ও এর আশপাশের বিভিন্ন সিএনজি স্টেশন প্রাঙ্গণ পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে যানজটের মতো দীর্ঘ লাইন। পাম্পগুলোতে গ্যাসের চাপ মারাত্মক কম থাকায় একেকটি গাড়িতে জ্বালানি পূর্ণ করতে স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সময় লাগছে। ফলে একটি গাড়ি সরলেও পেছনের অপেক্ষমাণ গাড়ির সারি ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই জায়গায় স্থবির হয়ে থাকছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই গাড়ি গ্যারেজে বসিয়ে রাখছেন, কিংবা অতিরিক্ত খরচ করে পেট্রোল-ডিজেলে গাড়ি চালাচ্ছেন।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ভাড়ায় চালিত সিএনজি অটোরিকশার চালকেরা। দৈনিক নির্ধারিত জমার টাকা তুলতেই এখন তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। মগবাজার এলাকার অটোরিকশাচালক আনোয়ার হোসেন জানান, প্রতিদিন অন্তত তিন থেকে চার ঘণ্টা কেবল গ্যাসের লাইনেই পার হয়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর মেলে সামান্য গ্যাস, যা নিয়ে কয়েক ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানো সম্ভব হয় না। আরেক চালক রাইসুল ইসলাম জানান, মালিককে প্রতিদিন ১,২০০ টাকা জমা দিতে হয়, অথচ পাম্পে গ্যাসের চাপ এতই কম যে একবারে ১০০ থেকে ১২০ টাকার বেশি নেওয়া যাচ্ছে না। ফলে দিনে একাধিকবার লাইনে দাঁড়াতে গিয়ে আয় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
চালকদের এই সংকটের চেইন ইফেক্ট পড়ছে সাধারণ নগরবাসীর ওপর। রাস্তায় অটোরিকশার সংখ্যা কমে যাওয়ায় যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারীরাও জরুরি কাজে বেরিয়ে পাম্পের লাইনে আটকে ভোগান্তিতে পড়ছেন। বেইলি রোডের বাসিন্দা রহমান শরীফ জানান, পাম্পে ১-২ ঘণ্টার বেশি সময় আটকে থাকার কারণে অফিসের নিয়মিত সময়সূচি মেনে চলা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে নিজের গাড়ি রেখে বিকল্প উপায়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
গ্যাস সরবরাহের সরকারি পরিসংখ্যানেও এই ঘাটতির চিত্র পরিষ্কার। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দেশে মোট ২৩২ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে, যার মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে ১৬২ কোটি এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে এসেছে ৭০ কোটি ঘনফুট। যদিও ঘাটতি সামাল দিতে সামিট টার্মিনালে আরামকোর এলএনজিবাহী একটি কার্গো যুক্ত হয়েছে।
এদিকে গ্যাস সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতেও। জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুতের চড়া চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কম থাকায় দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ের চাপ বেড়েছে। এর ওপর ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সেখান থেকে প্রত্যাশিত সরবরাহের অর্ধেকের কাছাকাছি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, যা বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আরও চাপে ফেলেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো গড়ার পরিকল্পনা নিয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল জানিয়েছে, ২০২৮ সালের মধ্যে মহেশখালীতে দৈনিক ৬০ কোটি ঘনফুট ক্ষমতার নতুন এফএসআরইউ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে মাতারবাড়ীতে দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট ক্ষমতার ল্যান্ডভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল চালুর লক্ষ্যে কাজ চলছে। তবে সরকারের এসব দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প চালু হওয়ার আগপর্যন্ত সাময়িক এই সংকট নগরবাসীকে কত দিন পোহাতে হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।


