বড় অদ্ভুত এক সময়ের সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা—এমন এক সময়, যখন সত্যের মুখেও মিথ্যার ছায়া, আর মিথ্যাও কখনো কখনো সত্যের চেয়েও অধিক বিশ্বাসযোগ্য। আসল-নকল, সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ, আলো-অন্ধকার—এমনকি দিন আর রাতের স্বাভাবিক পার্থক্যটুকুও যেন ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে। কোনটি বাস্তব, আর কোনটি নির্মিত—এই সহজ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেও আজ আমাদের থমকে দাঁড়াতে হয়।
মানুষের প্রকৃত মুখটিও যেন হারিয়ে যাচ্ছে মানুষেরই নির্মিত অসংখ্য মুখোশের ভিড়ে। বয়সকে আড়াল করে কেউ নিজেকে তরুণ করে তোলে, আবার অপরিণত কেউ প্রযুক্তির অলৌকিক আয়নায় নিজেকে প্রাপ্তবয়স্ক, পরিণত কিংবা অভিজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করে। প্রকৃতি আমাদের যে মুখ দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে, সেই মুখটিও আজ আর যথেষ্ট নয়। নিজের সহজাত সৌন্দর্যকে গ্রহণ করার বদলে আমরা তাকে আড়াল করি, পাল্টে দিই, মসৃণ করি, নিখুঁত করার নামে তার স্বাভাবিকতাকে মুছে ফেলি। বাইরে যেমন, ভেতরেও তেমনি—নিজস্ব স্বকীয়তার বদলে আমরা ক্রমশ পরিণত হচ্ছি একেকটি কৃত্রিম নির্মাণে।
একদিন মানুষের কণ্ঠস্বর ছিল তার অস্তিত্বের নিজস্ব স্বাক্ষর। আজ সেই কণ্ঠস্বরও নকল করা যায়, কেটে-ছেঁটে অন্য অর্থে ব্যবহার করা যায়, এমনকি এমন কিছু বলানো যায়—যা সে কোনোদিন বলেনি। একজন মানুষ অশ্লীল কিছু করেছে কি না, তার চরিত্র কেমন—এসব প্রশ্নেরও আর বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে উত্তর খোঁজার প্রয়োজন পড়ে না; প্রযুক্তির কারসাজিতে সত্যকে উল্টে দিয়ে একজন নির্দোষ মানুষকেও অপরাধীর আসনে দাঁড় করানো এখন যেন নিছক কৌশলমাত্র।
আর জ্ঞানের জগতেও ঘটছে এক অদ্ভুত রূপান্তর। যে মানুষটি হয়তো একটি বাক্যও শুদ্ধভাবে লিখতে পারে না, প্রযুক্তির সহায়তায় সে হয়ে উঠতে পারে বড় মাপের লেখক; যে কোনো ভাষার পণ্ডিতের মতো তার কথাবার্তা শোনাতে পারে; এমনকি এমন এক জ্ঞানের আবরণে নিজেকে মুড়ে ফেলতে পারে, যার গভীরে হয়তো তার নিজের কোনো অনুসন্ধানই নেই। জ্ঞান আর জ্ঞানের ভান—দুটির মাঝখানের সীমারেখাটিও যেন মুছে যাচ্ছে।
সৃষ্টিশীলতার জগতও আজ এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, সংগীত, নাটক, চিত্রকল্প কিংবা সিনেমা—সৃষ্টির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি মানুষের কল্পনাকে এমন এক ক্ষমতা দিয়েছে, যা একসময় কেবল স্বপ্নে কল্পনা করা যেত। নিজের পছন্দমতো একজন মানুষ সৃষ্টি করা যায়, তার মুখ, কণ্ঠ, শরীর, বয়স, পোশাক, চরিত্র—সবকিছু নির্ধারণ করা যায়। তার চারপাশের ঘর, বাড়ি, আসবাব, রাস্তা, নদী, মাঠ, শহর কিংবা একটি সম্পূর্ণ পৃথিবী পর্যন্ত নিজের মনের মতো করে সাজিয়ে নেওয়া যায় মুহূর্তের মধ্যে।
অর্থাৎ, কল্পনা আর বাস্তবতার মাঝখানে যে দেয়ালটি একদিন মানুষকে থামিয়ে দিত, প্রযুক্তি এসে সেই দেয়ালে যেন দরজা খুলে দিয়েছে।
এখন আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে কল্পনাকে শুধু কল্পনা করে রাখার প্রয়োজন নেই—তাকে দৃশ্যমান করা যায়, শ্রাব্য করা যায়, স্পর্শযোগ্য করে তোলা যায়; এমনকি এতটাই বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা যায় যে সত্য আর নির্মিত বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
আর সেখানেই শুরু হয়েছে এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা—কে কত সুন্দর করে কল্পনাকে বাস্তবের পোশাক পরাতে পারে, কে কত নিখুঁতভাবে মিথ্যাকে সত্যের মতো করে তুলতে পারে, কে কত আধুনিক ও বিশ্বাসযোগ্য এক কৃত্রিম জগত নির্মাণ করতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই অসীম ক্ষমতা অর্জনের পর আমরা আসলে কী হারাচ্ছি?
সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে পরিচিত মানুষ আজ নিজের সৃষ্টিশীলতার কাছে নিজেকেই বিসর্জন দিচ্ছে কি না, সেটিই হয়তো ভাবার সময় এসেছে। আমরা আসলকে সরিয়ে কল্পিতকে সামনে আনছি, স্বাভাবিকতাকে লজ্জার বিষয় মনে করছি, অসম্পূর্ণতাকে ত্রুটি হিসেবে দেখছি এবং নিখুঁত এক কৃত্রিমতার দিকে ছুটছি। পৃথিবী নামের এই প্রাচীন গ্রহটিকে আমরা যেন ধীরে ধীরে নকলের রঙিন ফানুশে ভরে দিচ্ছি—যার আলো আছে, কিন্তু উষ্ণতা নেই; সৌন্দর্য আছে, কিন্তু শিকড় নেই; দৃশ্য আছে, কিন্তু সত্য নেই।
তাহলে এই যে কৃত্রিমতার এত আয়োজন—এ কি সত্যিই মানবসভ্যতার অগ্রগতি? নাকি এটি মানুষের নিজের কাছ থেকেই মানুষের ক্রমশ দূরে সরে যাওয়ার এক নিঃশব্দ ইতিহাস?
যে পৃথিবীতে সত্যকে মিথ্যার মুখোশ পরিয়ে দেওয়া যায়, মানুষের কণ্ঠস্বরকে তার নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যায়, মানুষের মুখকে তার অচেনা মুখে রূপান্তর করা যায়, কল্পনাকে বাস্তবের চেয়েও বাস্তব করে তোলা যায়—তখন প্রশ্ন জাগে, এই প্রকৃতি কি এই মানুষদের কখনো ক্ষমা করবে?
হয়তো প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয় না, সে শুধু তার নিজস্ব নিয়মে হিসাব মেলায়। মানুষের অবিরাম লোভ, ভোগ আর আত্মপ্রবঞ্চনার বিপরীতে একদিন প্রকৃতিই হয়তো তার নীরব অথচ কঠিন উত্তরটি দিয়ে দেবে। তখন হয়তো আমরা বুঝতে পারব—প্রকৃতিকে জয় করার কোনো পথ নেই; প্রকৃতির সঙ্গে স্বাভাবিকতা নিয়ে সহাবস্থান করাই ছিল মানুষের সত্যিকারের সভ্যতা। আর সেই উপলব্ধি যদি আসতে আসতে খুব দেরি হয়ে যায়, তবে ক্ষমা চাওয়ার মতো সময়টুকুও হয়তো আর আমাদের হাতে থাকবে না।
মনজুর রশীদ বিদ্যুৎ
লেখক, কবি, গবেষক, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়ন এ্যাডভোকেট।


