নদীগ্রাসে নিঃস্ব ভিটেমাটি: বগুড়ায় বাঙালি ও করতোয়ার ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে হাজারো মানুষ

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর অবিরাম ভারী বর্ষণে বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় বাঙালি ও করতোয়া নদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নদী দুটির ফুঁসে ওঠা উত্তাল স্রোতে শুরু হয়েছে তীব্র ভাঙন। মুহূর্তের মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বসতবাড়ি, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি এবং বিভিন্ন সামাজিক অবকাঠামো। বিশেষ করে শেরপুরের খানপুর ইউনিয়নের চকখানপুর গ্রামে ভাঙনের রূপ এতটা ভয়াবহ যে, পুরো একটি প্রাচীন জনপদ এখন মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

চোখের সামনে তলিয়ে যাচ্ছে আজন্মের ঠিকানা

চকখানপুর গ্রামের হাওলাদার পাড়ার প্রধান পেশা মৎস্য শিকার। যুগ যুগ ধরে বাঙালি নদীকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে এখানকার মানুষের জীবিকা। কিন্তু জীবন বাঁচানো সেই নদীই এখন তাঁদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নদীতীরে বসে অশ্রুসজল চোখে দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন ৭৫ বছরের প্রবীণ বাসিন্দা চৈতন্য সরকার। ক্ষোভ ও বেদনামিশ্রিত কণ্ঠে তিনি বলেন, “কষ্ট কইরা এই গ্রাম গড়ছিলাম। একসময় ইহিনে (এখানে) ১৩০টি বাড়ি ছিল। নদী একে একে সব নিয়া গেছে। বাড়ি হারাইয়া মানুষও গ্রাম ছাইড়া চইলা গেছে। নদী আমাগারে নিঃস্ব কইরা দিছে। এই কষ্ট আর সহ্য হয় না।”

প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত দেড় দশকে শুধু এই গ্রামটি থেকেই প্রায় ১১০টি পরিবার গৃহহীন হয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ২০টি পরিবার। চলমান বর্ষা মৌসুমে যেভাবে নদীভাঙন শুরু হয়েছে, তাতে এই পরিবারগুলোর মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও টিকে থাকবে কিনা তা নিয়ে তীব্র সংশয় দেখা দিয়েছে। রায়চরণ হাওলাদার, জীতেন হাওলাদার ও নীলকান্ত হাওলাদারদের মতো অনেকেই জীবদ্দশায় একাধিকবার ভিটেমাটি সরিয়েছেন। কিন্তু এবার আর নতুন করে ঘর তোলার মতো সম্বল বা জমিও অবশিষ্ট নেই। ভুক্তভোগী সাধনা রানী হাওলাদার আক্ষেপ করে বলেন, “এ পর্যন্ত তিনবার ভাঙনের কারণে বাড়ি সরাইছি। এবার ভাঙলি নতুন বাড়ি বানানের জাগা নাই। দিনে–রাতে ঝপ ঝপ করে বাড়ির সামনে থাকা জায়গাটুকু নদীতে ভেঙে পড়ে। এই চিন্তায় রাইতে ঘুম আসে না।”

শেরপুরের নদীভাঙন পরিস্থিতির স্থানভিত্তিক পরিসংখ্যান

অনুসন্ধানে দেখা যায়, কেবল চকখানপুর নয়, শেরপুর উপজেলার মোট ৫টি ইউনিয়নের বিস্তৃত অংশে বাঙালি ও করতোয়া নদীর তাণ্ডব অব্যাহত রয়েছে। নদীর ভাঙনকবলিত পয়েন্ট এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি বিস্তারিত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:

ক্রম সংশ্লিষ্ট নদী ইউনিয়নের নাম ভাঙনকবলিত নির্দিষ্ট এলাকা/গ্রাম ভাঙনের আনুমানিক দৈর্ঘ্য (মিটার)
বাঙালি খানপুর বড়ইতলী উত্তর পাড়া ২৫০
বাঙালি খানপুর চকখানপুর (হাওলাদার পাড়া) ৪০০
বাঙালি খানপুর দহখানপুর পাড়া ১৫০
বাঙালি সুঘাট সুঘাট বাজার এলাকা (ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন) ৫০০
বাঙালি সুঘাট মধ্যভাগ গ্রাম ১৫০
বাঙালি সুঘাট বিনোদপুর (সাহেববাড়ি এলাকা) ৬০০
বাঙালি সুঘাট চকপাহাড়ি গ্রাম ৩০০
বাঙালি সীমাবাড়ি ঘাসুরিয়া গ্রাম ৩০০
বাঙালি সীমাবাড়ি নলুয়া গ্রাম ২০০
১০ বাঙালি খামারকান্দি খামারকান্দি (বাঁ তীর) ১০০
১১ বাঙালি খামারকান্দি ঝাজর উত্তর পাড়া ২০০
১২ করতোয়া গাড়িদহ ফুলবাড়ী ঘাটপার সেতু সংলগ্ন এলাকা ১৫০
১৩ করতোয়া গাড়িদহ কালশিমাটি স্কুল সংলগ্ন এলাকা ২০০
১৪ করতোয়া মির্জাপুর কাশিয়াবালা গ্রাম ২০০

বিপন্ন জনজীবন ও অবকাঠামোগত ক্ষতি

বাঙালি নদীর তীব্র স্রোতে নলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠের অন্তত ৪০ মিটার অংশ ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা।

অন্যদিকে, সীমাবাড়ি ইউনিয়নের ঘাসুরিয়া গ্রামের দিনমজুর দুই ভাই আবদুস সাত্তার ও আবদুস সালামের ঘরের এক-তৃতীয়াংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে রান্নাঘরের বাঁশের খুঁটি ঝুঁকিপূর্ণভাবে আটকে রান্না করছেন পরিবারের নারী সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, দুই বছর আগে পরিকল্পিতভাবে বাঙালি নদী খনন করা হলেও তার পর থেকে মূল পাড় ভাঙার তীব্রতা আগের চেয়ে বহু গুণে বেড়ে গেছে। অনেক জায়গায় শিশুদের দুর্ঘটনাবশত নদীতে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে স্থানীয় গৃহস্থরা কাপড় বা নেট দিয়ে নদীর পাড়ে বেড়া তৈরি করছেন।

প্রশাসনিক তৎপরতা ও বর্তমান প্রতিক্রিয়া

খানপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পিয়ার উদ্দিন, খামারকান্দি ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাজেদুর রহমান এবং গাড়িদহ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তবিবুর রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো সম্পর্কে উপজেলা প্রশাসনকে দ্রুত জরুরি ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

বগুড়া-৫ আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে এসে পাউবো কর্মকর্তাদের জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন।

পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান জানান, নদীভাঙনের বিষয়ে তারা সম্পূর্ণ সচেতন। তবে নতুন অর্থবছরের প্রয়োজনীয় সরকারি আর্থিক বরাদ্দ এখনো ছাড় করা হয়নি। অর্থ বরাদ্দ হাতে পাওয়া মাত্রই ভাঙন প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষামূলক কাজ শুরু করা হবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।