নাটোরের গুরুদাসপুরে বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষার্থীকে অপহরণের পর আটকে রেখে ধর্ষণের মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি মো. ফিরোজুল ইসলাম (৪৮) উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়েই এলাকায় মোটরসাইকেল বহর ও সমাবেশ করে প্রকাশ্যে হুমকিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির জেল থেকে বের হয়েই ভুক্তভোগীর পরিবারকে উদ্দেশ্য করে এমন বক্তব্য দেওয়ায় পুরো এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
দণ্ডপ্রাপ্ত ফিরোজুল ইসলাম গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর মরিয়ম মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। তিনি নাজিরপুরের দৌলতপুর গ্রামের গোলাম মোস্তফার ছেলে।
মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১ অক্টোবর ওই বালিকা বিদ্যালয়ের এক এসএসসি পরীক্ষার্থী ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে স্কুলে আসে। সে সময় বিদ্যালয়ের ফটকের সামনে থেকে প্রধান শিক্ষক ফিরোজুল ইসলাম ওই ছাত্রীকে জোরপূর্বক একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যান। পরবর্তীতে রাজশাহীর একটি আবাসিক হোটেলে তাকে আটকে রেখে ধর্ষণ করেন এবং ঘটনার দৃশ্য ভিডিওতে ধারণ করেন। এই ঘটনায় ভুক্তভোগী ছাত্রীর বাবা বাদী হয়ে গুরুদাসপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। ওই বছরের ১১ অক্টোবর রাতে গাজীপুরের কালিয়াকৈর থেকে র্যাব-৫-এর একটি দল অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে।
গুরুদাসপুর থানা পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন এবং চার জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্ত ফিরোজের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পান। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মলহিদুজ্জামান মুহিত রায় ঘোষণা করেন। সেখানে ফিরোজকে ধর্ষণের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অপহরণের অপরাধে পৃথক ধারায় আরও ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে অপর দুই আসামিকে খালাস দেওয়া হয়। রায়ের পর থেকেই তিনি কারাগারে বন্দি ছিলেন।
কিন্তু সাজা ঘোষণার মাত্র ১১ মাস পরই উচ্চ আদালত থেকে আপিলে জামিন পেয়ে মঙ্গলবার রাতে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান ফিরোজ। বের হওয়ার পরপরই তাঁর সমর্থকরা দুই শতাধিক গাড়ির একটি বিশাল বহর নিয়ে কারাগারের প্রধান ফটকে ফুল দিয়ে তাঁকে সংবর্ধনা জানান। পরে রাতেই নাজিরপুর এলাকায় কয়েকশ মানুষের উপস্থিতিতে এক মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা ও সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে ওই শিক্ষক বিচার ব্যবস্থা ও মামলার সাক্ষীদের একহাত নেন। তিনি বলেন, “আমাকে সাজা দিলো। বিচার কিন্তু শুরু হয়েছে। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি এই নাজিরপুরের মাটিতেই তাদের বিচার হবে।” তাঁর এই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে।
ঘটনার পর থেকে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ছাত্রীর বাবা। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘ তিন বছর নানা হুমকি ও প্রলোভন উপেক্ষা করে তিনি মেয়ের ন্যায়ের বিচার নিশ্চিত করার লড়াই চালিয়েছেন। এখন আসামি জেল থেকে বের হয়েই নাজিরপুরের মাটিতে বিচার করার হুমকি দিচ্ছেন। এতে তাঁর পুরো পরিবার এখন প্রাণভয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। বিষয়টি স্থানীয় থানাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নান জানান, আদালতের আপিলে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জামিন পেয়েছেন। তবে ভুক্তভোগী পরিবারকে বেআইনিভাবে কোনো প্রকার ভয়ভীতি বা হুমকি দেওয়া হলে অভিযোগের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


