র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে গঠিত ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন বিশেষায়িত ইউনিট বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করেছে। নতুন নামের গেজেট প্রকাশের পরই বাহিনীটির দাপ্তরিক কার্যক্রমে পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে আপাতত লোগোর নকশায় কোনো পরিবর্তন করা হয়নি; শুধু ‘র্যাব’-এর জায়গায় লেখা হয়েছে ‘এসআরবি বাংলাদেশ’।
বাহিনীপ্রধান আহসান হাবীব পলাশ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, এসআরবি নামে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে এবং বুধবার থেকেই নতুন নামে সব কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, আমন্ত্রণপত্রসহ দাপ্তরিক যোগাযোগেও নতুন নামের লোগো ব্যবহার করা হচ্ছে।
নতুন পরিচয়ের বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে বুধবারের সংবাদ সম্মেলনের আমন্ত্রণপত্রে। সেখানে আগের ‘র্যাব’ নামের পরিবর্তে ‘এসআরবি বাংলাদেশ’ লেখা লোগো ব্যবহার করা হয়েছে। তবে লোগোর মূল নকশা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বিভিন্ন ইউনিটের প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে।
সংসদে বিল পাসের পর আইনি কাঠামো
এসআরবির যাত্রার পেছনে রয়েছে গত কয়েক সপ্তাহের ধারাবাহিক আইনগত প্রক্রিয়া। গত ৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে র্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে এসআরবি গঠনের জন্য ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করা হয়। পরে বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছিল।
দীর্ঘ আলোচনা ও বিরোধী দলের আপত্তির মধ্যেই ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। নতুন আইনের মাধ্যমে র্যাবের আইনি ভিত্তি বাতিল করে পুলিশের অধীনে এসআরবি নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আইন প্রণয়নের সময় সরকার জানিয়েছিল, দেশের জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও গুরুতর অপরাধ দমন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একটি আধুনিক, পেশাদার, দক্ষ, বিশেষায়িত ও জবাবদিহিমূলক ইউনিট প্রয়োজন। নতুন ইউনিটকে সেই কাঠামোর ভিত্তিতে পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।
তবে বিলটি নিয়ে সংসদে বিরোধী দলের আপত্তিও ছিল। বিরোধী সদস্যদের বক্তব্য ছিল, র্যাবের জনবল, সম্পদ, স্থাপনা, নথিপত্র, তহবিল ও দায়দায়িত্ব এসআরবির কাছে হস্তান্তরের বিধান থাকায় নতুন বাহিনীটি কার্যত আগের কাঠামোরই ধারাবাহিকতা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, র্যাব বিলুপ্ত করেই নতুন বাহিনী গঠন করা হচ্ছে এবং এসআরবির সঙ্গে র্যাবের কোনো সংযোগ নেই।
র্যাব থেকে এসআরবি—দীর্ঘ পথ
র্যাব গঠিত হয়েছিল ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সন্ত্রাস, মাদক, সংঘবদ্ধ অপরাধসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ দমনে বাহিনীটির অভিযান পরিচালনার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। একই সময়ে বাহিনীটির বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও ওঠে। এসব অভিযোগের কারণে দেশ-বিদেশে র্যাবের কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক ছিল।
২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব এবং বাহিনীটির তৎকালীন ও সাবেক সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
পরবর্তী সময়ে র্যাব বিলুপ্ত বা পুনর্গঠনের দাবি আরও জোরালো হয়। ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর বিএনপি গঠিত পুলিশ প্রশাসন সংস্কারবিষয়ক কমিটিও র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটেই র্যাবের পরিবর্তে এসআরবি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত আগস্টে মন্ত্রিসভা ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় অনুমোদন দেয়। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী ইউনিটটি পুলিশের আওতায় পরিচালিত হওয়ার কথা বলা হয়।
এরপর ১০ সেপ্টেম্বর সংসদে বিল পাস এবং ১৫ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞাপন জারির মধ্য দিয়ে নতুন কাঠামো আইনি কার্যকারিতা পায়। তার পরদিনই মাঠপর্যায়ে নতুন নাম ব্যবহার শুরু করল ইউনিটটি।
ফলে বুধবার থেকে সরকারি ও দাপ্তরিক নথিতে ‘র্যাব’ নামের পরিবর্তে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ বা ‘এসআরবি’ নামটি কার্যকর হয়েছে। বাহিনীর পরিচিত লোগোও আপাতত একই থাকছে—শুধু নামের অংশে এসেছে পরিবর্তন। নতুন এই ইউনিট কীভাবে পরিচালিত হবে, তার জবাবদিহি ও কাঠামোগত পরিবর্তন বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা এখন এসআরবির পরবর্তী কার্যক্রমের ওপরই নির্ভর করবে।


