পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রাণঘাতী বল প্রয়োগের অধিকার পুলিশের আছে: উপদেষ্টা

আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এবং পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মাত্রায় বল প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশের প্রাণঘাতী বল ব্যবহারের অধিকার রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তবে এ ধরনের বল প্রয়োগ অবশ্যই আইনসম্মত হতে হবে এবং পরিস্থিতির প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের বল প্রয়োগের ক্ষমতা ও আন্দোলন মোকাবিলায় সরকারের অবস্থান নিয়ে কথা বলেন জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, পুলিশের বল প্রয়োগের আইনি অধিকার রয়েছে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রাণঘাতী বল প্রয়োগের সুযোগও আইনের আওতায় থাকতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত বল প্রয়োগ না করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, “পুলিশের বল প্রয়োগ করার আইনি অধিকার আছে। আইনি অধিকারের মধ্যে কাউকে হত্যা করার অধিকার পুলিশের আছে, যদি সেই ধরনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। যে কথাটা বারবার বলছি, আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে এবং প্রপোশনেট বল প্রয়োগের মাধ্যমে।”

আন্দোলন মোকাবিলায় আগের পদ্ধতি অনুসরণ করতে চায় না সরকার

দেশে কোনো অস্থিরতা বা আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতি তৈরি হলে সরকার কীভাবে তা মোকাবিলা করবে, সেই প্রশ্ন সামনে এনে উপদেষ্টা বলেন, অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সরকার অতীতের মতো আন্দোলন দমনের পথে যেতে চায় না। তাঁর ভাষায়, “বাংলাদেশের পুলিশ আর কখনো হাসিনার পুলিশের মতো হবে না।” এ বক্তব্যের ব্যাখ্যায় তিনি জানান, কথাটি তিনি শুধু সরকারে থাকা একজন ব্যক্তি হিসেবে নয়, একজন নাগরিক হিসেবেও বলছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের বল প্রয়োগের কিছু ভিডিও ও ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার প্রসঙ্গও উঠে আসে সংবাদ সম্মেলনে। এসব ঘটনার মধ্যে কোথাও কোথাও পরিস্থিতির তুলনায় অতিরিক্ত বল প্রয়োগের চিত্র দেখা গেছে বলে স্বীকার করেন উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কিছু ঘটনা মানুষ দেখেছেন, যেখানে বল প্রয়োগের মাত্রা পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যাতে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি নাগরিকদের ওপর ক্ষয়ক্ষতি ও ভোগান্তি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা যায়।

কিশোর গ্যাংসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও রাষ্ট্রের নাগরিক

কিশোর গ্যাং কিংবা অন্য কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অপরাধে জড়িত থাকলেও তাঁরা রাষ্ট্রের নাগরিক। ফলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আইন ও মানবিক বিবেচনা উপেক্ষা করা যায় না।

তিনি বলেন, “কারণ দিনের শেষে আমরা কিশোর গ্যাং বলি বা অন্য কাউকে বলি না কেন, এরা এই রাষ্ট্রের নাগরিক।”

তাঁর বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন হলেও সেই দায়িত্ব পালনের সময় বল প্রয়োগের মাত্রা, পরিস্থিতির বাস্তবতা এবং আইনি সীমারেখা বিবেচনায় রাখা জরুরি।

পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে বিতর্কের ক্ষেত্রে এ বিষয়গুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বল প্রয়োগের ক্ষমতা থাকলেও সেই ক্ষমতা যথেচ্ছভাবে ব্যবহারের সুযোগ নেই। বিশেষ করে প্রাণঘাতী বল প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা, আইনগত ভিত্তি এবং পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যের প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আন্দোলন মোকাবিলায় গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহারের কথা জানালেন উপদেষ্টা

আন্দোলনকারীদের কার্যক্রম ও পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকারের কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে বলেও জানান জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে কথা বলেছেন এবং সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য রয়েছে।

তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার এমন পদ্ধতি অনুসরণ করতে চায়, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কম পড়ে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা তথ্যের ব্যবহার কতটা কার্যকর হবে, তার পাশাপাশি অভিযানের ধরন ও বল প্রয়োগের মাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ বলে তাঁর বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয়।

উপদেষ্টা বলেন, সরকার চায়, পরিস্থিতি এমনভাবে মোকাবিলা করা হোক, যাতে জনগণের ভয়, ক্ষয়ক্ষতি ও ভোগান্তি যতটা সম্ভব কম থাকে।

এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি একদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের দায়িত্বের কথা তুলে ধরেছেন, অন্যদিকে সেই দায়িত্ব পালনের সময় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিয়েছেন।

পোশাকশ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড

সংবাদ সম্মেলনে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন এবং তাঁদের মজুরি নির্ধারণের বিষয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবন কঠিন হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলো বিবেচনায় নিয়ে সরকার আগেই নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে।

তাঁর মতে, শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে আলোচনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়েছে। এখন সেই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে।

জাহেদ উর রহমান বলেন, “আমরা আশা করি খুব অল্প সময়ের মধ্যে এটা শেষ হবে, কারণ প্রাথমিকভাবে কিন্তু শ্রমিকরাও মাঠে নেমেছিলেন, কারণ তাদের কিছু ন্যায্য দাবি ছিল। এখন যেহেতু কমিশন তৈরি হয়েছে, আমরা আশা করি তাদের আমরা বোঝাতে পারব।”

শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের বিষয়টি শুধু কর্মক্ষেত্রের দাবি নয়; এর সঙ্গে তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবারের ভরণপোষণ এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতাও জড়িত। মূল্যস্ফীতির সময়ে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা শ্রমজীবী মানুষের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে মজুরি নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে নতুন মজুরি বোর্ডের কার্যক্রম কত দ্রুত শেষ হবে এবং শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে কী ধরনের সিদ্ধান্ত আসবে, সে সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে নির্দিষ্ট সময়সীমা বা চূড়ান্ত মজুরির পরিমাণ জানানো হয়নি।

শ্রমিকদের আন্দোলনে অন্য পক্ষের সম্পৃক্ততার অভিযোগ

পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অন্য কোনো পক্ষ অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে অন্যরা সেখানে প্রবেশ করছে এবং পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে বলে সরকার মনে করছে।

তিনি বলেন, “আমাদের পোশাকশ্রমিকরা মাঠে নেমেছেন, সেটার ভেতরে ঢুকে অন্যরা এ কাজটি করছে। তারা না নামলে এ সমস্যা হয় না।”

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি এবং সেই দাবিকে কেন্দ্র করে অন্য পক্ষের সম্ভাব্য তৎপরতাকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। শ্রমিকদের প্রকৃত সমস্যার সমাধানে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে কেউ অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করলে তা মোকাবিলাও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।

সব মিলিয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের বল প্রয়োগ, আন্দোলন মোকাবিলায় সরকারের অবস্থান এবং পোশাকশ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ—এই তিনটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। উপদেষ্টার বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির সমাধানে আলোচনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে পুলিশের বল প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনের সীমা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া—দুই ক্ষেত্রেই সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।