জনপ্রিয়তার আলোর রোশনাই কিংবা প্রচারের মোহ যাকে কখনোই টানেনি, সংবাদের শিরোনাম হওয়ার চেয়ে শব্দের নিখুঁত বুননই যার কাছে সবচেয়ে বেশি অর্থবহ—তিনি সালাউদ্দিন সাগর। বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনের অন্যতম ব্যস্ত ও চাহিদাসম্পন্ন গীতিকার হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে সব সময় প্রচারের আড়ালে রাখতে ভালোবাসেন এই নিভৃতচারী শব্দসৈনিক। ‘যদি মনটা চুরি করি’, ‘কালাচান’, ‘দুই চাক্কার সাইকেল’ কিংবা ‘শিকারি’র মতো অসংখ্য তুমুল জনপ্রিয় গানের রচয়িতা তিনি। দেশের প্রথম সারির শীর্ষস্থানীয় শিল্পীদের কণ্ঠে নিয়মিত প্রতিধ্বনি হচ্ছে তার রচিত গান। এত সাফল্যের পরও আত্মপ্রচার নয়, বরং বিনয়ের সাথে তিনি মনে করেন—বিশাল বাংলা গানের সাগরে তিনি কেবলই একবিন্দু জল।
সালাউদ্দিন সাগরের জন্ম ১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলায়। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। তার সুর ও শব্দের সাথে সখ্য ছোটবেলা থেকেই। কৈশোরের স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই ছড়া ও কবিতা লেখার মাধ্যমে তার সাহিত্যচর্চার হাতেখড়ি হয়। সেসময় সহপাঠী ও শিক্ষকদের মাঝে তিনি ‘কবি’ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। সেই বয়সেই গান লিখে এক বন্ধুকে দিয়ে গাওয়াতেন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক বা বাণিজ্যিকভাবে আত্মপ্রকাশ করতে তাকে দীর্ঘ পথ পার হতে হয়েছে। ২০১৮ সালে তার লেখা গান প্রথম আলোর মুখ দেখে এবং ২০১৯ সাল থেকে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে গীতিকার হিসেবে তিনি শক্ত পরিচিতি লাভ করেন। গত আট বছরের পেশাদার ক্যারিয়ারে তিনি ইতিমধ্যেই প্রায় চারশত গান রচনা করেছেন।
সঙ্গীতকে পেশা নয়, বরং ভালোবাসার লালনক্ষেত্র বানিয়েছেন এই গীতিকার। তিনি বর্তমানে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন কর্মরত আছেন। করপোরেট চাকরির কঠিন নিয়মকানুনের বেড়াজাল পেরিয়েও তিনি নিজের ভেতরে থাকা সৃজনশীল সত্তাকে টিকিয়ে রেখেছেন পরম মমতায়। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে অবসর পেলেই খাতা-কলম নিয়ে বসে পড়েন গান রচনায়। তার কলম থেকে একে একে বেরিয়ে আসে আধুনিক, ফোক কিংবা মেলোডি ঘরানার শ্রোতানন্দিত সব গান।
চাকরি, পরিবার এবং গভীর রাতের গান লেখা—তিনটি বিষয়কে একসাথে সামলে নেওয়া মোটেই সহজ কাজ নয়। রাত জেগে গান লিখতে গিয়ে অনেক সময় পরিবারকে কাঙ্ক্ষিত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। এ নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে মাঝে মাঝে সামান্য মান-অভিমান হলেও গান যখন সুরের আলো পেয়ে সুপারহিট হয়, তখন পরিবারের সদস্যরাও সব অভিমান ভুলে আনন্দে ভেসে যান।
সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা ও প্রচারের আলো এড়িয়ে নীরব সাধনায় বিশ্বাসী সালাউদ্দিন সাগর চান কেবল নিজের কাজের মাধ্যমেই সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে। তার মতে, কাজ মানসম্মত হলে শ্রোতারা এমনিতেই তাকে আজীবন মনে রাখবেন। নিভৃতচারী এই গীতিকারের শব্দ আর সুরের এই নীরব রূপান্তর বাংলা গানকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করে চলেছে।



