চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে বাংলাদেশে উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ২৯ কোটি ৪৫ লাখ মার্কিন ডলার বিদেশি ঋণ এসেছে। একই সময়ে আগে নেওয়া ঋণের আসল ও সুদ বাবদ বাংলাদেশকে পরিশোধ করতে হয়েছে ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ নতুন করে যে পরিমাণ ঋণ এসেছে, তার তুলনায় প্রায় ২৩৭ শতাংশ বেশি অর্থ ঋণ পরিশোধে চলে গেছে।
রোববার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রকাশিত জুলাই–আগস্টের বিদেশি ঋণ পরিস্থিতির হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে পাওয়া ২৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলারের পুরো অর্থই এসেছে প্রকল্প ঋণ হিসেবে। তবে গত অর্থবছরের একই সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ এসেছিল ৭৫ কোটি ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে জুলাই–আগস্টে বিদেশি ঋণ ছাড় কমেছে ৬০ শতাংশের বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র ৪০ শতাংশের কাছাকাছি ঋণ ছাড় হয়েছে।
এ সময়ে সবচেয়ে বেশি অর্থ দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটি বাংলাদেশকে ১২ কোটি ৮৭ লাখ ডলার প্রকল্প ঋণ দিয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭ কোটি ৩৯ লাখ ডলার দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আর জাপান থেকে এসেছে প্রায় ৪ কোটি ডলার। বাকি অর্থ এসেছে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও দেশ থেকে।
অন্যদিকে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ অব্যাহত রয়েছে। জুলাই ও আগস্টে মোট ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে সরকার। এর মধ্যে ঋণের আসল বাবদ গেছে ৫১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। আর সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ১৮ কোটি ২৮ লাখ ডলারের বেশি।
গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের পরিশোধের পরিমাণ বাড়ছে। এর পেছনে আগের নেওয়া ঋণের কিস্তি এবং সুদ পরিশোধের দায় বড় হয়ে ওঠার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নতুন ঋণ ছাড়ের তুলনায় পুরোনো ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেশি হওয়া বৈদেশিক অর্থায়নের ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত অর্থবছরের জুলাই–আগস্টে সরকার বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে প্রায় ৬৭ কোটি ডলার পরিশোধ করেছিল। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে পরিশোধের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ডলারে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রথম দুই মাসেই ঋণ পরিশোধ বেড়েছে প্রায় ৩ কোটি ডলার।
তবে ঋণ ছাড় কমলেও ঋণের প্রতিশ্রুতির পরিমাণে তেমন পরিবর্তন হয়নি। চলতি অর্থবছরের জুলাই–আগস্টে বাংলাদেশ ২৪ কোটি ডলারের বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়েও প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ২৪ কোটি ডলার। অর্থাৎ নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি একই থাকলেও বাস্তবে অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে।
বিদেশি ঋণের অর্থ সাধারণত অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়। প্রতিশ্রুত ঋণ বাস্তবে ছাড় হতে প্রকল্পের প্রস্তুতি, চুক্তি, দরপত্র, বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট দাতা সংস্থার শর্ত পূরণের মতো বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে হয়। তাই কোনো অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ঋণ ছাড় কম হওয়া দিয়ে পুরো বছরের চিত্র নির্ধারণ করা যায় না।
তারপরও জুলাই–আগস্টের হিসাবটি সরকারের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তে থাকা পরিশোধের চাপের বিষয়টি স্পষ্ট করে। একদিকে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য নতুন ঋণের প্রয়োজন রয়েছে, অন্যদিকে অতীতে নেওয়া ঋণের কিস্তি ও সুদ নিয়মিত পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে ঋণ গ্রহণ, অর্থ ছাড় এবং ঋণ পরিশোধ—এই তিনটি সূচকের মধ্যে ভারসাম্য রাখা সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


