আন্তর্জাতিক বাজারের প্রচলিত মূল্যসূচকের তুলনায় বেশি দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। সাম্প্রতিক সময়ে স্পট বাজারে নেওয়া তিনটি কার্গোর ক্ষেত্রেই নির্ধারিত জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) সূচকের চেয়ে বেশি দাম দিতে হয়েছে। এতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে এবং একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা নিয়ে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে স্পট বাজারের দরপত্রের মাধ্যমে পেট্রোবাংলা তিনটি এলএনজি কার্গো কেনে। তিন কার্গোর জন্য মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। জেকেএম মূল্যসূচকের সঙ্গে তুলনা করলে এসব কার্গোর জন্য অন্তত ৩০০ কোটি টাকা বেশি দিতে হয়েছে বলে জানা গেছে।
এলএনজি সরবরাহের এই সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার, ওমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জির কাছ থেকে প্রত্যাশিত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বাংলাদেশকে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে স্পট বাজারের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
জ্বালানি বিভাগ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের এলএনজি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে চায়। সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি কার্গো। সেপ্টেম্বরের জন্য ইতোমধ্যে নয়টি কার্গোর ব্যবস্থা হয়েছে। অক্টোবরের জন্য দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় চারটি কার্গো পাওয়ার প্রত্যাশা করছে পেট্রোবাংলা।
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি গানভোরকে দুটি কার্গো সরবরাহের অনুরোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৮ সাল পর্যন্ত গানভোর জেকেএম মূল্যসূচক অনুসারে প্রতি ইউনিটে নির্ধারিত অতিরিক্ত ৮ সেন্টের ভিত্তিতে এলএনজি সরবরাহ করবে।
সরকার এখন স্পট বাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। জাপানের জেরা, দক্ষিণ কোরিয়ার পসকো, ইন্দোনেশিয়ার পারটার্মিনা এবং সৌদি আরবের আরামকোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে জেকেএম সূচকের চেয়ে কম দামে এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দ্রুত বিল পরিশোধসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে আগামী তিন মাসে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহে এখনো কোনো প্রতিষ্ঠান সম্মতি দেয়নি বলে জানা গেছে। এর ফলে সরবরাহ ঘাটতি মোকাবিলায় স্পট বাজারের প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকছে না।
সাম্প্রতিক একটি উদাহরণে অবশ্য স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে তুলনামূলক কম দামে এলএনজি কেনা সম্ভব হয়েছে। ১০-১১ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য সৌদি আরবের আরামকোর কাছ থেকে একটি কার্গো কেনার সিদ্ধান্ত নেয় ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। কার্গোটির দাম নির্ধারিত হয় প্রতি ইউনিট ২৩ দশমিক ৯৮ ডলার। একই সময়ে জেকেএম মূল্য ছিল ২৪ দশমিক ০৭৬ ডলার। অর্থাৎ সূচকের তুলনায় কিছুটা কম দামেই কার্গোটি পাওয়া গেছে।
কিন্তু স্পট বাজারের চিত্র ছিল ভিন্ন। ২৫-২৬ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর প্রতি ইউনিট ২৭ দশমিক ৫৪ ডলার দর প্রস্তাব করে। ওই সময় জেকেএম মূল্য ছিল সর্বোচ্চ ২৪ দশমিক ০৯ ডলার। ফলে একটি কার্গোর ক্ষেত্রেই প্রায় ৯০ লাখ ডলারের বেশি অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হয়েছে।
আরেকটি কার্গোর জন্য বিপি সিঙ্গাপুরের দর ছিল প্রতি ইউনিট ২৮ দশমিক ০৩ ডলার। ওই সময় জেকেএম মূল্য ছিল প্রায় ২৫ ডলার। এই কার্গোতেও প্রায় ৯০ লাখ ডলার অতিরিক্ত ব্যয়ের হিসাব পাওয়া গেছে। ৫-৬ অক্টোবর সরবরাহের জন্য বিটল ইশয়া লিমিটেডের দর ছিল প্রতি ইউনিট ২৬ দশমিক ৬৬৮৮ ডলার, যেখানে সংশ্লিষ্ট সময়ে জেকেএম মূল্য ছিল প্রায় ২৫ ডলার। এই কার্গোর ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে তিনটি কার্গোর দরপত্র আহ্বানের সময় প্ল্যাটস ও জেকেএমভিত্তিক বাজারদর ছিল প্রতি ইউনিট ২২ দশমিক ৮২ থেকে ২৪ দশমিক ৬১ ডলারের মধ্যে। সেই হিসাবেও স্পট বাজার থেকে কেনা কার্গোগুলোর দাম তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।
দাম বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ দেখিয়েছে পেট্রোবাংলা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে। একসময় যে এলএনজি ৯-১০ ডলারের মধ্যে পাওয়া যেত, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক বাজারে ২০ ডলারের বেশি দামে লেনদেন হচ্ছে বলে জ্বালানি বিভাগকে দেওয়া ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে গ্যাসের মান ও গঠন নিয়ে কিছু কারিগরি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমদানি করা এলএনজিকে দেশের উৎপাদিত প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে মেশাতে হয়। ফলে এলএনজির গড় তাপমান নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচলিত এলএনজির গড় তাপমান সাধারণত প্রতি মানক ঘনফুটে ১ হাজার ৯০ থেকে ১ হাজার ১১৮ বিটিইউয়ের মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশের জাতীয় গ্যাস ব্যবস্থার প্রয়োজন অনুযায়ী তা সমন্বয় করতে হয়। এই শর্তের কারণে সব সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহে সমান আগ্রহ দেখায় না।
তৃতীয় কারণ হিসেবে রয়েছে সরবরাহের সময়সীমা। স্পট বাজারে অনেক সময় খুব অল্প সময়ের মধ্যে কার্গো সরবরাহের জন্য দরপত্র আহ্বান করতে হয়। ফলে দূরবর্তী সরবরাহকারী, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কোম্পানি আগ্রহী হলেও প্রয়োজনীয় সময়ের মধ্যে কার্গো প্রস্তুত ও পরিবহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। প্রতিযোগী দরদাতার সংখ্যা কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই দর বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এ অবস্থায় সরকার স্পট বাজারের পাশাপাশি দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে একদিকে সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা যাবে, অন্যদিকে বাজারদরের তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের চাপও কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি ব্যয় ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।


