ইরান ও ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে চলমান সামরিক সংঘাতের জের ধরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী ও শোধনকারী দেশগুলো থেকে ডিজেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যটির দাম রেকর্ড উচ্চতায় গিয়ে ঠেকেছে। সরবরাহ ব্যবস্থার সাম্প্রতিক এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে আগামী দিনগুলোতে ডিজেলের দাম আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে হু হু করে বাড়ছে পরিশোধিত এই জ্বালানির দর। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপের জ্বালানি বাজারে ডিজেল ফিউচার্সের দাম গত সপ্তাহে সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায় স্পর্শ করেছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকের বাজারমূল্যের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বর্তমানে ইউরোপীয় বাজারে ডিজেলের দর দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে লোহিত সাগর রুটে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে দফায় দফায় বাধা সৃষ্টি হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য, সৌদি আরব থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হওয়া ডিজেলের সিংহভাগই এই কৌশলগত সমুদ্রপথ ব্যবহার করে পরিবাহিত হয়।
সংঘাতের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউক্রেন সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগার বা রিফাইনারি প্রত্যক্ষ ক্ষতির শিকার হয়েছে। এতে বিশ্বজুড়ে সার্বিক জ্বালানি শোধন সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং অন্যান্য দেশের সক্রিয় শোধনাগারগুলোর ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্টের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্রের তেল শোধনাগারগুলো গত আট বছরের মধ্যে তাদের সর্বোচ্চ সক্ষমতা ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রেখেছিল।
সোমবার প্রকাশিত বিশেষ বুলেটিনে আইইএ জানায়, বিশ্বের অধিকাংশ শোধনাগার বর্তমানে তাদের সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতায় কাজ করছে। ফলে আগামী কয়েক মাসে যদি নতুন করে সরবরাহ ব্যাহত হয়, তবে উৎপাদন বাড়িয়ে বৈশ্বিক বাজার স্থিতিশীল করার বা দাম বৃদ্ধির রাশ টানার সুযোগ একেবারেই সীমিত। পণ্যবাজার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘কেপলার’-এর জাহাজ চলাচল সংক্রান্ত ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি ২০২৬ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ববাজারে ডিজেল রপ্তানি পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে এসেছে। এই সময়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দৈনিক গড়ে মাত্র ৮ লাখ ব্যারেল ডিজেল জাহাজীকরণ করা সম্ভব হয়েছে। অথচ কেপলারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট আমদানিকৃত ডিজেলের প্রায় ৪১ শতাংশই সরবরাহ করেছিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো।
কেপলারের প্রধান বিশ্লেষক জর্জ শ এ প্রসঙ্গে জানান, লোহিত সাগরের বাণিজ্য পথে যদি নতুন করে কোনো নতুন বাধা আসে, তবে ইতোমধ্যেই সংকটে থাকা বৈশ্বিক ডিজেল বাজার চরম বিশৃঙ্খলার মুখে পড়বে। তার মতে, বর্তমানে পর্যাপ্ত শোধন ক্ষমতার অভাবই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে, ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় নিজেদের একাধিক শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয় বাজারে জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে জুলাই মাস থেকে ডিজেল রপ্তানিতে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে রাশিয়া। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধে সম্ভাব্য সমঝোতার ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবে দুই পক্ষই একে অপরের জ্বালানি কেন্দ্রে আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে। সার্বিক পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন বলে নিশ্চিত করেছেন।


