ব্যাংক পরিচালনায় পরিবারতন্ত্র ঠেকানোর সংস্কারেই পিছু হটছে সরকার

বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের সদস্যদের প্রভাব কমানো এবং ঋণখেলাপি পরিচালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যেসব সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছিল, সেগুলোর কয়েকটি থেকে সরে আসার পথে রয়েছে বর্তমান সরকার। ব্যাংক কোম্পানি আইনের নতুন খসড়ায় একই পরিবার থেকে সর্বোচ্চ তিনজনকে পরিচালক রাখার সুযোগ এবং পরিচালকদের টানা মেয়াদ ছয় বছরের পরিবর্তে নয় বছর করার প্রাথমিক অবস্থান নেওয়া হয়েছে। ঋণখেলাপি পরিচালকদের ক্ষেত্রেও আগের প্রস্তাবের তুলনায় কিছুটা ছাড় দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।

ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের অবস্থান এবং পরিচালকদের দীর্ঘ মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ ব্যাংকে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। অতীতে এসব সুযোগের অপব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। ফলে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো শিথিল করা হলে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

পরিচালকদের মেয়াদ নিয়ে নতুন সমীকরণ

বর্তমান ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, একই পরিবারের সর্বোচ্চ তিনজন সদস্য একসঙ্গে একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকতে পারেন। একজন পরিচালক একই ব্যাংকে টানা ১২ বছর দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান। এই মেয়াদ শেষ হলে তাঁকে তিন বছর বিরতি দিতে হয়; এরপর আবার পরিচালক হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের সদস্যসংখ্যা তিন থেকে কমিয়ে দুজনে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছিল। পাশাপাশি একজন পরিচালকের একটানা দায়িত্ব পালনের সর্বোচ্চ মেয়াদ ১২ বছর থেকে কমিয়ে ছয় বছর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনায় পারিবারিক প্রভাব কমানো এবং পরিচালনা পর্ষদে জবাবদিহি বাড়ানো।

তবে নতুন খসড়া পর্যালোচনার সময় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ প্রাথমিকভাবে একই পরিবার থেকে তিনজন পরিচালক রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। পরিচালকদের একটানা মেয়াদ ছয় বছরের পরিবর্তে নয় বছর করার বিষয়েও মত দিয়েছে বিভাগটি।

গত ২০ সেপ্টেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইনের খসড়া নিয়ে একটি পর্যালোচনা বৈঠক হয়। এতে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) এবং ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

৪ অক্টোবর প্রথম আলোকে নাজমা মোবারেক জানান, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত নেওয়া হয়েছে। তবে তখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক খসড়াটি আরও পর্যালোচনা করে পাঠানোর পর তা অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।

ব্যাংকমালিকদের আপত্তিতে পরিবর্তনের উদ্যোগ

বৈঠকে বিএবি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৈরি করা সংস্কার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। সংগঠনটির যুক্তি, একই পরিবার থেকে পরিচালকের সংখ্যা কমিয়ে দিলে ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো ও পরিচালনা পর্ষদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ধরনের পরিবর্তন আনার আগে ব্যাংকের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিএবির মতে, ব্যাংকের জন্য এমন পরিচালক দরকার, যাঁরা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের প্রতি মনোযোগী এবং দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্ব পালনে আগ্রহী। পরিচালকদের মেয়াদ বেশি কমিয়ে দিলে অভিজ্ঞতার ঘাটতি তৈরি হতে পারে এবং ব্যাংক খাতে নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে। তবে সংগঠনটি ১২ বছরের পরিবর্তে টানা নয় বছর মেয়াদের প্রস্তাব সমর্থন করছে।

বিএবির চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার প্রথম আলোকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৈরি করা খসড়ায় বেশ কিছু অসংগতি ছিল। বিএবি তখন মতামত দিলেও সেগুলো পুরোপুরি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বর্তমান সরকারের কাছে সংগঠনটি নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে। তাঁর জানা অনুযায়ী, নতুন খসড়ায় সেই মতামতগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

ব্যাংক খাতে পরিবারের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুল হাই সরকার বলেন, তাঁরা আশা করছেন, সরকার নতুন আইনে পুরো ব্যাংক খাতের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করবে।

তবে বিশ্লেষকেরা বিএবির যুক্তির সঙ্গে একমত নন। তাঁদের মতে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘদিন থাকার সুযোগ অতীতে মালিকদের প্রভাব বাড়িয়েছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

১২ বছরের মেয়াদ কীভাবে আইনে এল

ব্যাংক পরিচালকদের একটানা দায়িত্ব পালনের মেয়াদ ২০১৮ সালের আগে ছিল ছয় বছর। ওই বছর তা বাড়িয়ে নয় বছর করা হয়। ২০২৩ সালে আরেক দফা সংশোধনের মাধ্যমে মেয়াদ ১২ বছরে উন্নীত করা হয়।

২০২৩ সালের সংশোধনী ঘিরে জাতীয় সংসদে বিতর্কও হয়েছিল। ওই বছরের ৮ জুন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) বিল-২০২৩ সংসদে উত্থাপন করেন। বিলটির মূল প্রস্তাবে পরিচালকদের টানা মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি ছিল না। তবে বিল পাসের আগে সরকারি দলের সংসদ সদস্য আহসানুল ইসলাম এ বিষয়ে একটি সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী পরিচালকদের একটানা ১২ বছর দায়িত্ব পালনের সুযোগ রাখা হয়, যা শেষ পর্যন্ত পাস হয়।

সংশোধনীর প্রতিবাদে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। দলটির তৎকালীন সংসদ সদস্য মুজিবুল হক সংসদে ব্যাংকের পরিচালকদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও লুটপাটে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে বক্তব্য দেন। তাঁর বক্তব্যে ন্যাশনাল ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংকের দুরবস্থার প্রসঙ্গও উঠে আসে।

ব্যাংকমালিকদের চাহিদা অনুযায়ী ২০২৩ সালে পরিচালকদের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সে সময় বিএবির সাবেক সভাপতি ও এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার এ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ছিল। তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বিদেশে চলে গেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাবেক দুই গভর্নর ফজলে কবির ও আব্দুর রউফ তালুকদারও প্রকাশ্যে আসছেন না।

ব্যাংকে পরিবারতন্ত্রের প্রভাব ও সংকট

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো, প্রিমিয়ার গ্রুপ ও সিকদার গ্রুপসহ বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণে রেখে অনিয়ম-দুর্নীতি করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের পাশাপাশি স্ত্রী বা স্বামী, ছেলে-মেয়ে, জামাতা এবং অন্যান্য নিকটাত্মীয়কে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে স্থান দিয়েছেন।

ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের প্রভাব থাকলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। পরিচালকদের সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ প্রাধান্য পেলে ঋণ বিতরণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে ব্যাংক পরিচালনায় স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

পরিবারকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণে থাকা কয়েকটি ব্যাংক বর্তমানে আর্থিক সংকটে রয়েছে। এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়েও সমস্যা দেখা দিয়েছে। সংকট মোকাবিলায় পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন ব্যাংকটির মূলধন জোগাতে সরকারি কোষাগার থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের অনিয়মের আর্থিক চাপের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত জনগণের করের অর্থ দিয়ে সামাল দিতে হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধনী খসড়া তৈরি করেছিল। তবে সেই সরকার খসড়াটি অধ্যাদেশ হিসেবে জারি করে যেতে পারেনি।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ৪ অক্টোবর প্রথম আলোকে বলেন, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়গুলো সংশোধিত আইনে গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

‘পরিবার’-এর সংজ্ঞা কতটা বিস্তৃত হবে

একই পরিবারের সদস্যরা যাতে ভিন্ন আত্মীয়তার পরিচয় ব্যবহার করে একই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকার সুযোগ না পান, সে জন্য ‘পরিবার’-এর সংজ্ঞা বিস্তৃত করার প্রস্তাব দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গভর্নর ছিলেন আহসান এইচ মনসুর।

বর্তমান আইনে পরিবারের সদস্য বলতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্ত্রী বা স্বামী, বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন এবং তাঁর ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিকে বোঝানো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবে ভাবি, ভগ্নিপতি, শ্বশুর-শাশুড়ি, শ্যালক-শ্যালিকা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল অন্যদেরও এই সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল, পারিবারিক সম্পর্কের ভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করে পরিচালনা পর্ষদে প্রভাব ধরে রাখার সুযোগ সীমিত করা।

তবে বিএবি পরিবারের সংজ্ঞা স্বামী-স্ত্রী ও নির্ভরশীল ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পক্ষে। সংগঠনটি যুক্তি দিয়েছে, বিভিন্ন দেশের আইনেও পরিবারের সংজ্ঞা এক রকম নয়। ভারতের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী বা হিন্দু অবিভক্ত পরিবার, পাকিস্তানে স্বামী-স্ত্রী, নির্ভরশীল সরাসরি বংশধর ও নির্ভরশীল ভাই-বোন এবং শ্রীলঙ্কায় স্বামী-স্ত্রী বা নির্ভরশীল সন্তানকে পরিবারের সংজ্ঞার আওতায় ধরা হয় বলে সংগঠনটি উল্লেখ করেছে।

তবে বাংলাদেশে পরিবারতন্ত্রের প্রভাব কমানোর প্রশ্নটি নতুন নয়। ১৯৯৬ সালে অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের নেতৃত্বাধীন ব্যাংক সংস্কার কমিটির প্রতিবেদনে একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে না রাখার সুপারিশ করা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পরও বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক চলতে থাকা ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, আন্তর্জাতিক চর্চার আলোকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কমানো, স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা বাড়ানো এবং পরিচালকদের মেয়াদ সীমিত করার প্রস্তাব তৈরি হয়েছিল। সেসব উদ্যোগ থেকে সরে আসা হতাশাজনক। তাঁর মতে, পরিচালকদের মধ্যে ‘আমার ব্যাংক’ বা ‘আমাদের পরিবারের ব্যাংক’—এ ধরনের মনোভাব দূর করতে আইন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।

ঋণখেলাপি পরিচালকদের জন্য শিথিল হচ্ছে বিধান

ব্যাংক কোম্পানি আইনের বর্তমান বিধান অনুযায়ী, কোনো পরিচালকের নিজের ঋণ অথবা তাঁর গ্যারান্টি দেওয়া ঋণ খেলাপি হলে তা নিয়মিত করার জন্য দুই মাস সময় দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ নিয়মিত করতে ব্যর্থ হলে তিনি পরিচালকের পদ হারাতে পারেন। এ ছাড়া তাঁর শেয়ার বিক্রি করে ঋণের অর্থ সমন্বয়ের বিধানও রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের খসড়ায় এ বিষয়ে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রস্তাব ছিল। কোনো পরিচালকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি হলেও সংশ্লিষ্ট পরিচালককে পদ হারাতে হবে—এমন বিধান অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছিল।

নতুন খসড়ায় সেই প্রস্তাব বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি পরিচালক পদ হারানোর পর আবার পরিচালক হওয়ার জন্য অপেক্ষার সময় এক বছর থেকে কমিয়ে ছয় মাস করার উদ্যোগ রয়েছে। এতে ঋণখেলাপি পরিচালকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আগের প্রস্তাবের তুলনায় বিধান শিথিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কোনো পরিচালকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপির সম্পর্ক থাকলে তা ব্যাংকের ঝুঁকি মূল্যায়ন ও ঋণ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারে। তাই শুধু পরিচালকের ব্যক্তিগত ঋণের অবস্থা বিবেচনা করলে সংশ্লিষ্ট স্বার্থের সংঘাত পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৭ ধারায় বর্তমানে আমানতকারী বা ব্যাংকের স্বার্থবিরোধী কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়া গেলে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি ব্যাংকের পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিতে পারে। এরপর প্রশাসক বা উপযুক্ত ব্যক্তিকে ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার বিধান রয়েছে।

নতুন খসড়ায় পরিচালনা পর্ষদ বহাল রেখেই প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। অর্থাৎ পুরো পর্ষদ ভেঙে না দিয়েও প্রয়োজন হলে প্রশাসকের মাধ্যমে ব্যাংকের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতে পারবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এই ব্যবস্থায় সংকটের সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থার সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে পর্ষদ বহাল রেখে প্রশাসক নিয়োগ করলে ব্যাংকের অনিয়ম কতটা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের ক্ষমতা ও প্রশাসকের দায়িত্বের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

বর্তমান আইনে আমানতকারীদের স্বার্থের পরিপন্থীভাবে পরিচালিত ব্যাংকের নতুন আমানত গ্রহণ বন্ধ করার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে ওই ব্যাংকের ঋণ বিতরণও নিষিদ্ধ করতে পারে। নতুন খসড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠানে নতুন ঋণ, বিনিয়োগ বা মূলধন সরবরাহ বন্ধ করার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

এ ছাড়া ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া দেনাদার কোম্পানির পরিচালকদের পদত্যাগ, বরখাস্ত, অপসারণ বা অব্যাহতি দেওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপের কথা বলা হয়েছে। অনুমোদন ছাড়া তাঁদের শেয়ার হস্তান্তর বা বিক্রি করার সুযোগও সীমিত করার প্রস্তাব রয়েছে। এসব বিধান কার্যকর হলে ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত স্বার্থ সুরক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা বাড়তে পারে।

স্বতন্ত্র পরিচালক অর্ধেক করার প্রস্তাবেও আপত্তি

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৈরি করা খসড়ায় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ১৫ সদস্যের করার এবং এর অর্ধেক, অর্থাৎ ৫০ শতাংশ সদস্যকে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে রাখার প্রস্তাব ছিল। পাশাপাশি মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য বা স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের পরিচালনা পর্ষদে থাকার সুযোগ বন্ধ করার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।

বর্তমানে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে সর্বোচ্চ ২০ জন সদস্য থাকার সুযোগ রয়েছে। স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার বিধানও আছে, তবে তাঁদের সংখ্যা প্রস্তাবিত ৫০ শতাংশের তুলনায় অনেক কম।

বিএবি স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা দুই থেকে তিনজনের মধ্যে রাখার পক্ষে মত দিয়েছে। সংগঠনটির যুক্তি, পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালকের সংখ্যা অর্ধেক হলে শেয়ারমালিকদের নিয়ন্ত্রণ কমে যেতে পারে এবং ব্যাংকের মুনাফা ও প্রবৃদ্ধির তুলনায় নীতিপালনের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নেওয়ার পর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সর্বোচ্চ তিনজন স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার পক্ষে রয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে পরিচালনা পর্ষদে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নজরদারি বাড়ানোর যে প্রস্তাব করা হয়েছিল, তা সীমিত হয়ে আসতে পারে।

সংস্কার শিথিল হলে নতুন সংকটের আশঙ্কা

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, অতীতে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ লুটপাটের বড় অংশ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের যোগসাজশে ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় পরিচালকদের একটানা মেয়াদ ছয় বছরে নামিয়ে আনা এবং একই পরিবার থেকে সর্বোচ্চ দুজনকে পরিচালক রাখার প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

তাঁর আশঙ্কা, এসব সংস্কার শিথিল করার উদ্যোগ ব্যাংক খাতে নতুন বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে সংশোধনী খসড়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে তিনি আশা করছেন, সরকার ব্যাংক খাতের সামগ্রিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাবগুলো পুনর্বিবেচনা করবে।

ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধন কেবল পরিচালকদের মেয়াদ বা পরিবারের সদস্যসংখ্যা নির্ধারণের বিষয় নয়। এর সঙ্গে আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা, পরিচালকদের জবাবদিহি এবং ব্যাংকের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন জড়িত। অতীতে দীর্ঘ মেয়াদ ও পারিবারিক প্রভাব নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে কি না, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

সংশোধিত আইনের চূড়ান্ত রূপ নির্ধারিত হবে পরবর্তী পর্যালোচনা ও মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। তবে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনর্গঠনের জন্য শুধু আইন সংশোধন যথেষ্ট নয়; সেই আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণও জরুরি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।