ভাটারার বাড়িতে ডিবির অভিযান, আটক পুলিশ কর্মকর্তার দুই মেয়ে

রাজধানীর ভাটারা থানাধীন পুলিশ হাউজিং-১ এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে ৮৪ জনকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের উত্তরা বিভাগ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৮ জন তরুণ ও ২৬ জন তরুণী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে এক পুলিশ কর্মকর্তার দুই মেয়েও আছেন। অভিযানে মদ, গাঁজা, ইয়াবা, কনডম এবং মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে একজন আফগানিস্তানের নাগরিকও রয়েছেন।

সোমবার গভীর রাতে বাড়িটিতে অভিযান চালানো হয়। গোয়েন্দা পুলিশের দাবি, সেখানে ডিজে পার্টির আড়ালে মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অনৈতিক ও নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড চলার তথ্য ছিল। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালনা করা হয়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বাড়িটির মালিকানা, অনলাইনে ভাড়া দেওয়ার পদ্ধতি, তদারকির ব্যবস্থা এবং সেখানে দীর্ঘদিন ধরে কী ধরনের কার্যক্রম চলছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বাড়িটির মালিক পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) আব্দুল্লাহ আল জহির। ঘটনার পর তাঁকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। মঙ্গলবার পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের সই করা অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর আগে তিনি পুলিশ সদর দপ্তরের রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখায় দায়িত্ব পালন করছিলেন।

ডিবি পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িটিতে নিয়মিত ডিজে পার্টি আয়োজন, মাদক সেবন এবং মাদকের কারবার চলার অভিযোগের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। অভিযানে আটক ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই এবং উদ্ধার করা আলামত পরীক্ষা করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে আটক প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।

অনলাইনে ভাড়া দেওয়া হতো পাঁচ কক্ষের বাড়ি

সাড়ে ছয় কাঠা জমির একাংশে নির্মিত তিনতলা বাড়িটি অনলাইন ভাড়াভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম এয়ারবিএনবির মাধ্যমে ভাড়া দিতেন আব্দুল্লাহ আল জহির। বাড়িটি দেখাশোনার জন্য মাহবুব আলম নামের একজনকে কো-হোস্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তি অনলাইনে বুকিং দিয়ে বাড়িটি ভাড়া নিতেন। কেউ সেখানে রাত কাটাতেন, আবার কেউ আয়োজন করতেন ডিজে পার্টি।

গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির সংবাদমাধ্যম যুগান্তরকে জানান, বাড়িটিতে মোট পাঁচটি কক্ষ রয়েছে। অনলাইনে বুকিংয়ের মাধ্যমে এসব কক্ষ ভাড়া দেওয়া হতো। কোনো কোনো অনুষ্ঠানে একটি কক্ষ প্রায় ১০ জন মিলে ভাড়া নিতেন। অতিরিক্ত লোকজন অংশ নিলে জনপ্রতি ৬০০ টাকা করে নিবন্ধন ফি নেওয়া হতো বলে জানান তিনি।

ডিসি ইলিয়াস কবিরের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িটিতে দুপুর ১২টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা কিংবা ১১টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান চলত। মাসে প্রায় ১৮ থেকে ২০টি অনুষ্ঠান আয়োজনের তথ্যও তিনি দিয়েছেন। প্রতিটি অনুষ্ঠানের জন্য প্রায় এক লাখ টাকা ভাড়া নেওয়া হতো বলে তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশের দাবি, এসব অনুষ্ঠানের আড়ালে মাদক সেবনসহ নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড চলছিল। অভিযানে মদ, গাঁজা, ইয়াবা, কনডম এবং ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে বলে ডিবি সূত্র জানিয়েছে। তবে জব্দ করা মাদকের পরিমাণ, এর উৎস এবং বাড়িটিতে মাদক বিক্রির কার্যক্রম পরিচালিত হতো কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

বাড়ি ভাড়ার আয় ও সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন

বাড়িটি অনলাইনে ভাড়া দিয়ে যে আয় হতো, তার ৭০ শতাংশ আব্দুল্লাহ আল জহিরের ব্যাংক হিসাবে জমা পড়ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ তথ্য সামনে আসার পর বাড়িটির ভাড়া থেকে অর্জিত আয়ের পাশাপাশি ভাটারা এলাকায় সাড়ে ছয় কাঠা জমি কেনার অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

তবে জমি কেনার অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে—এমন তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। একইভাবে বাড়িটি কত দিন ধরে ভাড়া দেওয়া হচ্ছিল এবং সেখানে অভিযোগ অনুযায়ী কর্মকাণ্ড কত দিন ধরে চলছিল, তা-ও তদন্তের বিষয়।

এয়ারবিএনবি একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যার মাধ্যমে বাড়ির মালিক বা অনুমোদিত ব্যবস্থাপক অতিথিদের কাছে কক্ষ, অ্যাপার্টমেন্ট কিংবা সম্পূর্ণ বাড়ি স্বল্প বা দীর্ঘ সময়ের জন্য ভাড়া দিতে পারেন। এ ধরনের ব্যবস্থায় বুকিংয়ের সুবিধা থাকলেও ভাড়াটেদের পরিচয় যাচাই, বাড়ির ব্যবহারসংক্রান্ত শর্ত নির্ধারণ এবং স্থানীয় আইন মেনে চলার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বাড়ি তালিকাভুক্ত থাকাই সেখানে বেআইনি কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার প্রমাণ নয়।

বাড়ির মালিকের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির যুগান্তরকে বলেন, তিনি অনলাইনে বাড়িটি ভাড়া দিতেন এবং ভাড়ার ক্ষেত্রে কিছু কঠোর নিয়মও ছিল। তাঁর দাবি, অসৎ উদ্দেশ্যে তিনি বাড়িটি ভাড়া দিতেন না। দেশি-বিদেশি অনেকেই সেখানে অবস্থান বা অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য বুকিং নিতেন।

আব্দুল্লাহ আল জহিরের ভাষ্য, কেউ ভাড়া নিয়ে অসামাজিক কর্মকাণ্ড করার চেষ্টা করলে অতীতে তা প্রতিহত করা হয়েছে। এবার একটি জন্মদিনের অনুষ্ঠানের কথা বলে বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। ভাড়াটেরা সেখানে মদ নিয়ে আসবেন কিংবা অন্য কোনো নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডে জড়াবেন, সে বিষয়ে তিনি আগে থেকে জানতেন না বলে দাবি করেন তিনি।

তবে বাড়ির মালিকের এই বক্তব্য এবং গোয়েন্দা পুলিশের অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। বাড়িটি ভাড়া দেওয়ার শর্ত কী ছিল, বুকিংয়ের সময় অতিথিদের পরিচয় যাচাই করা হতো কি না এবং অনুষ্ঠান চলাকালে তদারকির ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তদন্তের অগ্রগতির দিকে নজর

এ ঘটনায় আটক ৮৪ জনের মধ্যে পুলিশ কর্মকর্তার দুই মেয়ের উপস্থিতির বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ রয়েছে কি না, কিংবা তাঁরা কী পরিস্থিতিতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে আটক আফগান নাগরিকের পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়েও অতিরিক্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃতি, উদ্ধার করা আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং মাদকদ্রব্যের উৎস শনাক্ত করার মধ্য দিয়ে মামলার পরবর্তী অগ্রগতি নির্ধারিত হবে। বাড়িটির মালিক হিসেবে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের কোনো দায় রয়েছে কি না, সেটিও প্রমাণ ও তদন্তের ভিত্তিতে বিবেচিত হবে।

ঘটনার পর তাঁকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপ। এটি নিজে থেকে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ করে না। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকা নির্ধারণ করতে হবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।