ভারতের বিপক্ষে আবারও বড় ব্যবধানে হারল বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল। জাপানের নিশিনোর কোরোগি স্পোর্টস পার্কে এশিয়ান গেমসের সেমিফাইনালে শেফালি বর্মার বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের সামনে কার্যত অসহায় হয়ে পড়ে বাংলাদেশের মেয়েরা। শেফালির আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরির ওপর ভর করে ভারত ১৯৫ রান সংগ্রহ করে। জবাবে বাংলাদেশের ইনিংস থেমে যায় মাত্র ৮১ রানে। ফলে ১১৪ রানের বিশাল জয় নিয়ে ফাইনালে উঠেছে ভারত।
রোববারের এই জয়ে ভারত স্বর্ণপদকের লড়াইয়ে জায়গা করে নিয়েছে। ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা। ফলে ২০২৩ সালের হাংঝৌ এশিয়ান গেমসের নারী ক্রিকেটের ফাইনালের পুনরাবৃত্তিও হতে যাচ্ছে। সেবারও স্বর্ণের লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছিল ভারত ও শ্রীলঙ্কা।
টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমেই বাংলাদেশের বোলারদের ওপর চড়াও হন ভারতের দুই ওপেনার শেফালি বর্মা ও স্মৃতি মন্ধনা। ম্যাচের শুরুটা এতটাই দ্রুত ছিল যে পাওয়ারপ্লের ছয় ওভারেই ভারতের স্কোর দাঁড়ায় ৭২ রানে। বাংলাদেশের বোলাররা কোনোভাবেই দুই ওপেনারের আক্রমণের গতি থামাতে পারছিলেন না।
এই ইনিংসে ব্যক্তিগত একটি মাইলফলকও স্পর্শ করেন স্মৃতি। নারী আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকায় সুজি বেটসকে ছাড়িয়ে যান তিনি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে নিজের ১০০তম ছক্কাও পূর্ণ করেন ভারতের এই অভিজ্ঞ ওপেনার। তবে ৩৭ রান করে নাহিদা আক্তারের বলে আউট হওয়ার পর ভারতের ইনিংসে সাময়িকভাবে ছন্দপতন ঘটে।
স্মৃতির বিদায়ের পর জি কামালিনীও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। ১০ বল খেলে মাত্র ৩ রান করে ফেরেন তিনি। এতে ভারতের রান তোলার গতি কিছুটা কমে যায়। কিন্তু অন্য প্রান্তে শেফালি ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন মেজাজে।
ছক্কা মেরে অর্ধশতক পূর্ণ করেন শেফালি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে নিজের ১০০তম ছক্কাও পূর্ণ করেন তিনি। এরপর অধিনায়ক হারমানপ্রীত কৌরকে নিয়ে শুরু করেন আরও ভয়ংকর আক্রমণ। দুজনের জুটি থেকে আসে ৯৪ রান। বাংলাদেশের বোলারদের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়তে থাকে।
নাহিদা আক্তার ও মারুফা আক্তারের করা এক ওভারে ২২ রান তুলে নেন শেফালি। বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের ওপর তাঁর আধিপত্য তখন পুরোপুরি স্পষ্ট। শেষ পর্যন্ত ইনিংসের শেষ বলে কাভার-পয়েন্টের দিকে বল ঠেলে দিয়ে তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগারে পৌঁছান তিনি। ৪৯ বলে ৯টি ছক্কা ও ৩টি চারে ১০০ রানে অপরাজিত থাকেন শেফালি।
আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এটি তাঁর প্রথম সেঞ্চুরি। আর সেই সেঞ্চুরির সুবাদেই ভারত নির্ধারিত ২০ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ১৯৫ রানের বড় সংগ্রহ দাঁড় করায়। বাংলাদেশের সামনে তখন ছিল ১৯৬ রানের কঠিন লক্ষ্য।
জবাব দিতে নেমে শুরু থেকেই বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ। ভারতের বোলিং আক্রমণের সামনে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে তারা। দিলারা আক্তার ও অধিনায়ক নিগার সুলতানা ছাড়া বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ দেখা যায়নি।
দিলারা ২৭ রান করেন। নিগারের ব্যাট থেকে আসে ৯ রান। দুজন মিলে ২৯ রানের একটি জুটি গড়লেও সেটি বাংলাদেশের ইনিংসকে বড় কোনো ভিত্তি দিতে পারেনি। এই দুজনের পর কেবল একজন বাংলাদেশি ব্যাটার দুই অঙ্কের রান স্পর্শ করতে পেরেছেন। ফলে বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ইনিংসের মাঝপথেই ম্যাচ থেকে কার্যত ছিটকে যায় বাংলাদেশ।
ভারতের স্পিন ও পেস—দুই ধরনের বোলিংয়ের সামনেই বাংলাদেশের ব্যাটাররা সমস্যায় পড়েন। মাত্র ১৫ দশমিক ৪ ওভারেই ৮১ রানে অলআউট হয়ে যায় বাংলাদেশ। ১১৪ রানের ব্যবধান শুধু ম্যাচের ফলই নয়, দুই দলের ব্যাটিংয়ের পার্থক্যও স্পষ্ট করে দেয়।
ভারতের হয়ে জন্মদিনে বল হাতে নেমে দারুণ সময় কাটান নন্দিনী শর্মা। নিজের প্রথম বলেই উইকেট নিয়ে শুরু করেন তিনি। পরে আরও দুটি উইকেট তুলে নিয়ে শেষ করেন ৩ উইকেটের কৃতিত্ব নিয়ে। তাঁর বোলিং ফিগার ৩/২৫। সবচেয়ে কার্যকর ছিলেন দীপ্তি শর্মা। মাত্র ৭ রান দিয়ে ৩ উইকেট নেন এই স্পিনার। শ্রী চরাণীও বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে চাপ বাড়িয়ে ৭ রানে নেন ২ উইকেট।
বাংলাদেশের জন্য ভারতের বিপক্ষে এই হার আরও হতাশার, কারণ খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে একই প্রতিপক্ষের কাছে আবার বড় ম্যাচে হারতে হলো। এর এক সপ্তাহ আগেই নারী এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারতের কাছে ৪০ রানে হেরেছিল বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে শিরোপার লড়াইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পর এশিয়ান গেমসের সেমিফাইনালেও ভারতের সামনে একই ধরনের অসহায় পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে।
দুটি ম্যাচের ব্যবধানও তাই বাংলাদেশের জন্য ভাবনার জায়গা তৈরি করবে। এশিয়া কাপের ফাইনালে ৪০ রানের হার আর এশিয়ান গেমসের সেমিফাইনালে ১১৪ রানের পরাজয়—দুই ম্যাচেই ভারতের বিপক্ষে বড় মঞ্চে ব্যাটিংয়ের সক্ষমতা বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
এদিকে ভারতের জন্য ম্যাচটি ছিল একাধিক অর্জনের। দল ফাইনালে উঠেছে, শেফালি পেয়েছেন আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টির প্রথম সেঞ্চুরি, আর স্মৃতি মন্ধনা স্পর্শ করেছেন ব্যক্তিগত দুটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ফলে বাংলাদেশের বিপক্ষে সেমিফাইনালটি ভারতীয় দলের জন্য ব্যক্তিগত ও দলীয়—দুই দিক থেকেই স্মরণীয় হয়ে থাকল।
এখন ভারতের সামনে স্বর্ণপদকের লড়াই। ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা। বাংলাদেশের জন্য এশিয়ান গেমসের অভিযান শেষ হয়েছে সেমিফাইনালেই। তবে ভারতের বিপক্ষে পরপর দুই বড় ম্যাচের ফল বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটের ব্যাটিং ও ম্যাচ পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বড় লক্ষ্য তাড়া করার সময় চাপ সামলে জুটি গড়া এবং দীর্ঘ সময় উইকেটে থাকার সক্ষমতা—এসব জায়গায় উন্নতির প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এসেছে।


