বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে এই স্মরণীয় জয় পায় শ্রীলঙ্কা। ম্যাচজুড়ে দুই দলের ব্যাটারদের দাপটে মোট রান হয়েছে ৮৫৯। ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মিলিত রান। একই সঙ্গে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সফল রান তাড়ার কীর্তিও গড়েছে লঙ্কানরা।
ম্যাচের শেষ ওভারে জয়ের জন্য শ্রীলঙ্কার প্রয়োজন ছিল ৮ রান। তখনো ম্যাচ জয়ের আশা ছাড়েনি ইংল্যান্ড। তবে জশ টংয়ের করা শেষ ওভারের পঞ্চম বলে লং-অফের ওপর দিয়ে ছক্কা হাঁকিয়ে সব হিসাব পাল্টে দেন জানিথ লিয়ানাগে। তাঁর ব্যাট থেকেই আসে ঐতিহাসিক জয়ের শেষ মুহূর্তটি।
এর আগে ব্যাট করতে নেমে ইংল্যান্ডের ইনিংসের মূল আকর্ষণ ছিলেন অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক। শুরুতে কিছুটা ধীরগতিতে খেললেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভয়ংকর হয়ে ওঠেন তিনি। প্রথম ২৪ বলে মাত্র ১৩ রান করা ব্রুক পরবর্তী সময়ে শ্রীলঙ্কার বোলারদের ওপর রীতিমতো ঝড় তোলেন।
মাত্র ৭৫ বলে শতক পূর্ণ করার পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন ইংলিশ অধিনায়ক। একের পর এক বাউন্ডারিতে দ্রুত রান বাড়িয়ে ১১৪ বলেই দ্বিশতক স্পর্শ করেন তিনি। ওয়ানডে ক্রিকেটে ইংল্যান্ডের প্রথম ব্যাটার হিসেবে দ্বিশতক করার কীর্তি গড়েন ব্রুক।
শুধু ইংল্যান্ডের প্রথম দ্বিশতকই নয়, দ্রুততম দ্বিশতকের বিশ্বরেকর্ডও নিজের করে নেন তিনি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এর আগে গত মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১১৭ বলে দ্বিশতক করেছিলেন ভারতের শুভমান গিল। সেই রেকর্ড তিন বল কম খেলে ছাড়িয়ে যান ব্রুক।
ইংলিশ অধিনায়কের বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ৪২৯ রান সংগ্রহ করে ইংল্যান্ড। ওয়ানডে ক্রিকেটে এটি দলটির চতুর্থ সর্বোচ্চ সংগ্রহ। বিদেশের মাটিতে টেস্ট খেলুড়ে কোনো দেশের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ ওয়ানডে সংগ্রহও এটি।
এত বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই বিপর্যয়ে পড়ে শ্রীলঙ্কা। দলীয় মাত্র ২৪ রানে ২ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে লঙ্কানরা। তখন মনে হচ্ছিল, ইংল্যান্ডের বিশাল সংগ্রহের সামনে হয়তো বড় ব্যবধানেই হারতে হবে তাদের।
তবে সেই পরিস্থিতি থেকে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন পবন রথনায়েকে ও অবিষ্কা ফার্নান্দো। দুজনের দায়িত্বশীল ও আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায় শ্রীলঙ্কা। বিশেষ করে চার নম্বরে ব্যাট করতে নামা রথনায়েকে ইংলিশ বোলারদের ওপর পাল্টা চাপ সৃষ্টি করেন।
১০৬ বলে ১৩০ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলেন রথনায়েকে। তাঁর ইনিংসে ছিল ১৫টি চার ও তিনটি ছক্কা। বড় লক্ষ্য তাড়া করার চাপ সামলে নিয়মিত বাউন্ডারি আদায় করে নেন তিনি। ফলে প্রয়োজনীয় রান তোলার গতি ধরে রাখতে সক্ষম হয় শ্রীলঙ্কা।
অন্য প্রান্তে অবিষ্কা ফার্নান্দোও দুর্দান্ত ব্যাটিং করেন। মাত্র তিন রানের জন্য শতক হাতছাড়া হলেও তাঁর ৯৭ রানের ইনিংস দলের জয়ের ভিত গড়ে দেয়। এরপর দাসুন শানাকাও ৯৭ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলে শ্রীলঙ্কাকে লক্ষ্যের আরও কাছে নিয়ে যান।
তিন ব্যাটারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একসময় অসম্ভব মনে হওয়া লক্ষ্যও শ্রীলঙ্কার নাগালে চলে আসে। ইংল্যান্ডের বোলাররা মাঝের ওভারগুলোতে লঙ্কান ব্যাটারদের রানের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হন। ফলে ম্যাচ যত এগিয়েছে, ততই জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে শ্রীলঙ্কার সামনে।
তবে শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণের জন্য অপেক্ষা করতে হয় শেষ ওভার পর্যন্ত। জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় রান তুলে নেওয়ার দায়িত্ব তখন জানিথ লিয়ানাগের কাঁধে। চাপের মুহূর্তে জশ টংয়ের বল সীমানার বাইরে পাঠিয়ে দলের জয় নিশ্চিত করেন তিনি।
এই জয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সফল রান তাড়ার রেকর্ড গড়েছে শ্রীলঙ্কা। এর আগে ২০০৬ সালে জোহানেসবার্গে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪৩৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করে জয় পেয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। সেই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার ৪৩৪ রানের জবাবে ৯ উইকেটে ৪৩৮ রান তুলে ইতিহাস গড়েছিল প্রোটিয়ারা।
দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে দুই দলের সম্মিলিত সংগ্রহ ছিল ৮৭২ রান, যা এখনো ওয়ানডে ক্রিকেটে সর্বোচ্চ সম্মিলিত রানের রেকর্ড। ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার ম্যাচে মোট ৮৫৯ রান হওয়ায় সেই রেকর্ডের মাত্র ১৩ রান দূরে থেমেছে দুই দল।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডের জন্য ম্যাচটি হয়ে থাকল হতাশার। অধিনায়ক ব্রুকের অসাধারণ দ্বিশতক এবং ৪২৯ রানের বিশাল সংগ্রহের পরও জয় ধরে রাখতে পারেনি দলটি। বিশেষ করে অভিজ্ঞ স্পিনার আদিল রশিদের অনুপস্থিতিতে ইংল্যান্ডের বোলিং আক্রমণ কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।
শুরুতে দ্রুত দুই উইকেট তুলে নিলেও পরবর্তী সময়ে শ্রীলঙ্কার ব্যাটারদের সামনে সুবিধা করতে পারেননি ইংলিশ বোলাররা। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট তুলে নিতে না পারা এবং রান দেওয়ার গতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়াই শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দুর্দান্ত ১৩০ রানের ইনিংসের স্বীকৃতি হিসেবে ম্যাচসেরার পুরস্কার পান পবন রথনায়েকে। তবে শ্রীলঙ্কার এই ঐতিহাসিক জয়ে অবিষ্কা ফার্নান্দো, দাসুন শানাকা ও জানিথ লিয়ানাগের অবদানও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একদিকে হ্যারি ব্রুকের রেকর্ডগড়া দ্বিশতক, অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার অবিশ্বাস্য রান তাড়া—সব মিলিয়ে ম্যাচটি ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতে বিপর্যয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার যে দৃঢ়তা লঙ্কানরা দেখিয়েছে, সেটিই তাদের এনে দিয়েছে অসাধারণ এক জয়।


