মঙ্গলবার ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ বি এম তারিকুল কবীরের আদালত আসামিপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন। এর আগে আজ মামলাটির রায় ঘোষণার জন্য দিন নির্ধারিত ছিল। কিন্তু আসামিপক্ষ নতুন করে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের আবেদন জানালে আদালত তা গ্রহণ করেন। এখন উভয় পক্ষের আইনজীবীদের আবারও মামলার বিভিন্ন দিক নিয়ে যুক্তি উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হলো।
মামলার আট আসামির মধ্যে সোহেল রানা ছাড়াও রয়েছেন সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র রেফাত উল্লাহ, সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায়, নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান রাসেল, সাবেক টাউন প্ল্যানার ফারজানা ইসলাম এবং লাইসেন্স পরিদর্শক মো. আবদুল মোত্তালিব।
আসামিদের বর্তমান অবস্থাতেও ভিন্নতা রয়েছে। সোহেল রানা এ মামলায় জামিনে থাকলেও ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় তিনি কারাগারে রয়েছেন। মঙ্গলবার তাঁকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। মাহবুবুর রহমান ও ফারজানা ইসলাম পলাতক। অন্য আসামিরা জামিনে থেকে আদালতে হাজিরা দিয়েছেন।
যে ঘটনার পর শুরু হয় তদন্ত
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে সাভার বাসস্ট্যান্ডের কাছে রানা প্লাজা ভবন ধসে পড়ে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বহুতল ভবনটি ধসে পড়ায় সেখানে কর্মরত পোশাকশ্রমিকসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় ১ হাজার ১৩৬ জনের বেশি মানুষ নিহত হন এবং আহত হন আরও বহু মানুষ।
দেশের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ শিল্পদুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত এই ভবনধসের পর ভবনটির নকশা অনুমোদন, অতিরিক্ত তলা নির্মাণ এবং পোশাক কারখানা স্থাপনের অনুমতির বিষয়গুলো নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন ভবন নির্মাণ ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের বিষয়টি অনুসন্ধান শুরু করে।
২০১৪ সালের ১৫ জুন নকশাবহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণের অভিযোগে সাভার থানায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন। তদন্ত এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মামলায় আসামির সংখ্যা ও অভিযোগের পরিধিতেও পরিবর্তন আসে।
প্রাথমিক মামলায় সোহেল রানাকে আসামি করা হয়নি। কারণ, ভবনটির মালিকানা তাঁর বাবার নামে ছিল। তবে অধিকতর তদন্তে ভবনটির নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সোহেল রানার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার দাবি করে তদন্ত সংস্থা। পরে তাঁকে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
অভিযোগপত্রে যেসব অনিয়মের কথা বলা হয়েছে
মামলার অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ‘রানা প্লাজা’ নামে ছয়তলা একটি শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য ২০০৬ সালের ১০ এপ্রিল সাভার পৌরসভা নকশা অনুমোদন করে। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালের ২২ জানুয়ারি ভবনটির ওপর আরও চারতলা নির্মাণের অনুমোদন চাওয়া হয়।
শুধু তলা বাড়ানোর বিষয়েই অভিযোগ সীমাবদ্ধ ছিল না। শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্দেশ্যে অনুমোদন নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে ভবনটিতে পাঁচটি পোশাক কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। ভবনের নকশা অনুমোদন, অতিরিক্ত তলা নির্মাণ এবং পোশাক কারখানা স্থাপনের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়।
২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি অধিকতর তদন্ত শেষে সোহেল রানা, তাঁর মা-বাবাসহ মোট ১৮ জনকে আসামি করে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। পরে অভিযোগ গঠনের সময় আটজনকে মামলা থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং ১০ আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সোহেল রানার মা ও বাবার মৃত্যু হলে তাঁদেরও মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
২০১৭ সালের ২১ মে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে মামলাটির বিচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। বিচারপর্বে রাষ্ট্রপক্ষের ২০ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৯ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে উভয় পক্ষের আইনজীবীরা তাঁদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন এবং মামলাটি রায় ঘোষণার পর্যায়ে পৌঁছায়।
তবে রায় ঘোষণার নির্ধারিত দিনেই মামলাটি আবার যুক্তিতর্কের পর্যায়ে ফিরে যাওয়ায় এখন নতুন করে শুনানি হবে। আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরই জানা যাবে, বহুল আলোচিত এই মামলার রায় কবে ঘোষণা করা হবে। দীর্ঘ সময় ধরে বিচারাধীন থাকা মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিকে এখন সংশ্লিষ্টদের নজর থাকবে।


