রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক একীভূতকরণে বড় সংস্কারের ঘোষণা বাংলাদেশ ব্যাংকের

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বহুল প্রতীক্ষিত ও সুদূরপ্রসারী সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশের নয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে একীভূত করে দুটি বড় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক গোষ্ঠী গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার ঢাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এ পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেন। তিনি এটিকে গত কয়েক দশকের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত সংস্কার হিসেবে উল্লেখ করেন।

গভর্নরের বক্তব্য অনুযায়ী, এই একীভূতকরণের মূল লক্ষ্য হলো করপোরেট সুশাসন জোরদার করা, আর্থিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা। তিনি বলেন, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বছরের পর বছর ধরে উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং জনআস্থার সংকটে ভুগছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ৬১টি তফসিলি ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা অর্থনীতির আকার বিবেচনায় অত্যধিক বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গভর্নরের মতে, ব্যাংকের সংখ্যা যত বেশি হয়, তদারকি তত কঠিন হয়ে পড়ে—বিশেষ করে যখন অনেক প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত মূলধনহীন বা দুর্বল শাসন কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। তার মূল্যায়নে, ১০ থেকে ১৫টি শক্তিশালী, পেশাদার ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এবং পর্যাপ্ত মূলধনসম্পন্ন ব্যাংক নিয়ে গঠিত একটি ব্যবস্থা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য বেশি কার্যকর হবে।

আন্তর্জাতিক উদাহরণ তুলে ধরে তিনি ভারতের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে গত এক দশকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো একীভূত করা হয়েছে, যদিও ভারতের অর্থনীতি বাংলাদেশের তুলনায় বহুগুণ বড়। পাশাপাশি সিঙ্গাপুরের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে একটি প্রধান ব্যাংকের ব্যালান্স শিটের আকারই প্রায় বাংলাদেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের সমান।

বর্তমানে বাংলাদেশের নয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত—বাণিজ্যিক, উন্নয়ন এবং বিশেষায়িত। প্রস্তাবিত কাঠামোয় এসব ব্যাংককে দুটি বড় গোষ্ঠীতে পুনর্গঠন করা হবে। তবে কোন ব্যাংক কোন গোষ্ঠীতে যাবে এবং বাস্তবায়নের সময়সূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বর্তমান শ্রেণিবিন্যাস

শ্রেণি অন্তর্ভুক্ত ব্যাংক
বাণিজ্যিক সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক
উন্নয়ন বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক
বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক

এই উদ্যোগটি বাংলাদেশ ব্যাংকের বৃহত্তর আর্থিক খাত সংস্কার কর্মসূচির অংশ। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্বল কয়েকটি বেসরকারি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে এবং কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসান প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গভর্নর জানান, কয়েক দশকের অপশাসন ও রাজনৈতিক প্রভাবের ফলে ব্যাংকিং খাতে আনুমানিক তিন লাখ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে, যার একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ এ প্রস্তাবকে সময়োপযোগী ও অপরিহার্য বলে মনে করছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে সরকার ২৫ হাজার কোটির বেশি টাকা মূলধন সহায়তা দিয়েছে, তবু খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনকভাবে উচ্চ রয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় একীভূতকরণকে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফেরানো, আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জনআস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।