ভারতের শীর্ষ শিল্পপতি মুকেশ আম্বানির সম্পদে এক দিনেই যুক্ত হয়েছে প্রায় ৮৫০ কোটি মার্কিন ডলার। তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফনের ফলে এই সম্পদ বেড়েছে। এর মধ্য দিয়ে চীনের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ঝাং ইমিংকে পেছনে ফেলে আবারও এশিয়ার শীর্ষ ধনীর অবস্থান দখল করেছেন আম্বানি।
ফোর্বসের রিয়েল টাইম বিলিয়নিয়ার্স তালিকার তথ্য অনুযায়ী, সোমবার মুকেশ আম্বানির মোট সম্পদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৮৮০ কোটি মার্কিন ডলারে। এক দিনে তাঁর সম্পদ বেড়েছে প্রায় ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। এই উত্থানের ফলে বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের তালিকায় তিনি ২৩তম স্থানে উঠে এসেছেন। অন্যদিকে, ঝাং ইমিংয়ের সম্পদের পরিমাণ ৮ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। ফলে এশিয়ার ধনীদের মধ্যে আম্বানি তাঁর চেয়ে প্রায় ৪৮০ কোটি ডলার এগিয়ে রয়েছেন।
আম্বানির সম্পদ বৃদ্ধির প্রধান কারণ রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি। সোমবার ভারতের বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে (বিএসই) প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ২৯৯ রুপিতে পৌঁছায়। ছয় বছরের বেশি সময়ের মধ্যে এক দিনে কোম্পানিটির শেয়ারের এত বড় উত্থান দেখা যায়নি। এর ফলে এক দিনেই রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের বাজারমূল্য বেড়েছে ১ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের বেশি।
কোম্পানিটির সর্বশেষ ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের আয় হয়েছে ২৫ হাজার ৫৫০ কোটি রুপি, যা মার্কিন মুদ্রায় প্রায় ২৭০ কোটি ডলার। অথচ এই সময়ে বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ছিল ২১ হাজার ৩৬৭ কোটি রুপি বা প্রায় ২৩৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ প্রত্যাশার তুলনায় কোম্পানিটির আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হয়েছে।
বিশেষ করে তেল পরিশোধন ও রাসায়নিক পণ্য উৎপাদন ব্যবসায় ভালো ফল এবং টেলিযোগাযোগ খাতের মুনাফা বৃদ্ধির কারণে কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। রিলায়েন্সের ব্যবসার এই ইতিবাচক চিত্র বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে। শেয়ারবাজারে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় শেয়ারের দামেও তার প্রতিফলন ঘটেছে।
আম্বানির সম্পদ বৃদ্ধির পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল সেবাপ্রতিষ্ঠান জিও প্ল্যাটফর্মসের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি। গত ২৮ অক্টোবর ভারতের শেয়ারবাজারে প্রতিষ্ঠানটির অভিষেক হয়। দেশটির ইতিহাসের বৃহত্তম প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ৩২০ কোটি মার্কিন ডলার সংগ্রহ করছে। আইপিওতে জিও প্ল্যাটফর্মসের মূল্যায়ন করা হয়েছিল প্রায় ১০ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির প্রথম দিনেই প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম ২৭ শতাংশ বেড়ে যায়। এই সাফল্যও আম্বানির সামগ্রিক সম্পদের মূল্যায়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
মুকেশ আম্বানি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তাঁর বাবা ধীরুভাই আম্বানি ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু করেন। কয়েক দশকের ব্যবধানে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে রিলায়েন্স ভারতের অন্যতম বৃহৎ বহুমুখী শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে তেল ও গ্যাস, পেট্রোকেমিক্যাল, টেলিযোগাযোগ, খুচরা ব্যবসা, গণমাধ্যম এবং আর্থিক সেবাসহ বিভিন্ন খাতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বিস্তৃত।
বাজারমূল্যের বিচারে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ ভারতের সবচেয়ে বড় কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য প্রায় ১৮ হাজার ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার। ২০২৬ সালে ফোর্বসের ‘গ্লোবাল ২০০০’ তালিকায় বিশ্বের বৃহত্তম তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে রিলায়েন্সের অবস্থান ছিল ৫৫তম। তালিকাটির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক বিক্রি ১১ হাজার ৯৭০ কোটি ডলার, মোট সম্পদের পরিমাণ ২২ হাজার ৯৬০ কোটি ডলার এবং মুনাফা ৯১০ কোটি ডলার।
রিলায়েন্সের ব্যবসায়িক বিস্তার এবং বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই আম্বানি বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের তালিকায় অবস্থান করছেন। বিশেষ করে ভারতের টেলিযোগাযোগ ও খুচরা বিক্রয় খাতে তাঁর প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী অবস্থান সম্পদ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
তবে শেয়ারবাজারের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পদের মূল্যায়ন সরাসরি সম্পর্কিত। কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়লে ওই কোম্পানিতে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তার মালিকানাধীন শেয়ারের বাজারমূল্যও বেড়ে যায়। আবার শেয়ারের দর কমলে কাগজে-কলমে তাঁর সম্পদের পরিমাণও কমে যেতে পারে। সে কারণে আম্বানির সম্পদে এক দিনের এই বড় উল্লম্ফনকে তাঁর হাতে নগদ অর্থের সরাসরি বৃদ্ধি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের আর্থিক সাফল্য এবং জিও প্ল্যাটফর্মসের শেয়ারবাজারে অভিষেক—দুই ঘটনাই আম্বানির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের প্রতিফলন। এশিয়ার শীর্ষ ধনীর অবস্থান ফিরে পাওয়ার মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক ধনীদের তালিকায়ও তাঁর অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।


