বিতর্ক, সমালোচনা এবং সম্ভাব্য আইনি জটিলতা—সবকিছুর মধ্যেও ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ২০২৭ সালের নির্বাচনে আবারও সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন। এর মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে চতুর্থ মেয়াদে যাওয়ার পথেই এগোচ্ছেন তিনি।
ফিফার এক মুখপাত্রের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনায় কোনো পরিবর্তন আনেননি ইনফান্তিনো। গত এপ্রিলেই তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই সিদ্ধান্ত এখনো বহাল রয়েছে।
পোল্যান্ডে চলমান অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন ইনফান্তিনো। তবে নেতৃত্ব নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক কিংবা নিজের পুনর্নির্বাচনের পরিকল্পনা সম্পর্কে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি তিনি। উদ্বোধনী ম্যাচে পোল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার খেলা চলাকালে গ্যালারিতে পোলিশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি চেজারি কুলেশার সঙ্গে তাকে কথা বলতে দেখা যায়।
পরে স্টেডিয়ামের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ইনফান্তিনো বলেন, তার বলার মতো অনেক বিষয় রয়েছে। তবে সেগুলো তিনি উপযুক্ত সময় ও উপযুক্ত মঞ্চেই তুলে ধরবেন। ওই সময় তিনি ফুটবলকে ঘিরে ফিফার কার্যক্রমের কথাই বেশি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন।
কিন্তু ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক এখন আর কেবল রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক সমালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব ব্যবস্থাপনা এবং নতুন ব্যবসায়িক কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা ঘিরে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার সঙ্গে ফিফার বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। এ বিরোধ শেষ পর্যন্ত সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপের আলোচনাতেও গড়িয়েছে।
পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপ এবং ক্লাব বিশ্বকাপের মতো বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক স্বত্ব ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি নতুন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে আপত্তি তুলেছে উয়েফা। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালতের কাছে নথিপত্র চেয়ে আবেদন করেছে সংস্থাটি। উয়েফা জানিয়েছে, ফিফা সভাপতি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি তারা বিবেচনা করছে।
ফিফা অবশ্য উয়েফার উদ্যোগকে প্রত্যাখ্যান করেছে। সংস্থাটির ভাষ্য, এটি মূলত অযৌক্তিকভাবে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা। ফিফার দাবি, সুইজারল্যান্ড বা অন্য কোনো দেশে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়নি। ফলে অভ্যন্তরীণ নথিপত্র চাওয়ার আইনগত ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তারা।
ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে সমালোচনার আরেকটি বড় বিষয় তার আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক যোগাযোগ। বিশেষ করে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে প্রথমবারের মতো ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ প্রদান করার ঘটনাটিও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
বিশ্ব ফুটবলের অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়েও ইনফান্তিনোর সময়ে বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ দেখা গেছে। ফিফার আয় বাড়ানো এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক মূল্য আরও বাড়ানোর প্রচেষ্টাকে তিনি সংস্থাটির ভবিষ্যৎ আর্থিক সক্ষমতার অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করে, অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ ফুটবলের ঐতিহ্য ও ভাবমূর্তির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
ইনফান্তিনো ২০১৬ সালে ফিফা সভাপতি নির্বাচিত হন। এর আগে তিনি ইউরোপীয় ফুটবলের প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০১৬ সালে সেপ ব্লাটার পদত্যাগ করার পর বিশেষ কংগ্রেসে নির্বাচিত হয়ে ফিফার দায়িত্ব নেন তিনি। পরে ২০১৯ এবং ২০২৩ সালে পুনর্নির্বাচিত হন।
চতুর্থ মেয়াদে প্রার্থিতা নিয়ে মূল বিতর্কটি তৈরি হয়েছে মেয়াদের হিসাবকে কেন্দ্র করে। ফিফার প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী একজন সভাপতি চার বছর করে সর্বোচ্চ তিন মেয়াদ দায়িত্ব পালন করতে পারেন। কিন্তু ইনফান্তিনোর যুক্তি হলো, ২০১৬ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ব্লাটারের অসমাপ্ত মেয়াদের অংশ পূরণ করেছিলেন। তাই ওই সময়টিকে তার নিজস্ব পূর্ণ মেয়াদের মধ্যে গণনা করা উচিত নয়।
এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করেছেন সমালোচক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অনেকে। তারা বিষয়টি পর্যালোচনা করে তাকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার দাবি তুলেছেন। ফিফার গভর্ন্যান্স, অডিট অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স কমিটির কাছেও এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ফিফার নেতৃত্বে ইনফান্তিনোর অবস্থান তাই একদিকে শক্তিশালী, অন্যদিকে ক্রমেই বিতর্কিত হয়ে উঠছে। বিভিন্ন আঞ্চলিক কনফেডারেশন ও জাতীয় ফুটবল সংস্থার সমর্থন নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তিনি পদত্যাগের কোনো ইঙ্গিত দেননি এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অবস্থানও স্পষ্ট রেখেছেন।
২০২৭ সালের ফিফা সভাপতি নির্বাচন হবে ১৮ মার্চ মরক্কোর রাবাতে। সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী প্রার্থীদের ১৮ নভেম্বরের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা ঘোষণা করতে হবে। ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিরা ভোট দেবেন। নির্বাচনে জয়ী হতে প্রয়োজন হবে অন্তত ১০৬টি ভোট।
ফলে আগামী কয়েক মাস ইনফান্তিনোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একদিকে তাকে নিজের মেয়াদসংক্রান্ত অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিতে হবে, অন্যদিকে ফিফার বাণিজ্যিক পরিকল্পনা ও ইউরোপীয় ফুটবল প্রশাসনের সঙ্গে বিরোধ সামাল দিতে হবে। সব মিলিয়ে ২০২৭ সালের নির্বাচন শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়, ফিফার ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক দিকনির্দেশনারও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।


