কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সার নিয়ে কৃষকদের ভোগান্তি কমছে না। আমন, সবজি এবং রবি মৌসুমের আগাম সবজি চাষের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন কৃষকেরা। অন্যদিকে কৃষি বিভাগের দাবি, জেলায় সারের প্রকৃত ঘাটতি নেই; বরং অনেক কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। ফলে বরাদ্দ ও মাঠপর্যায়ের চাহিদা নিয়ে তৈরি হয়েছে স্পষ্ট মতপার্থক্য।
কৃষকদের অভিযোগ, বিভিন্ন বিক্রয়কেন্দ্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চাহিদামতো সার পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও একজন কৃষক এক বস্তা সার পেলেও কয়েকজন মিলে একটি বস্তা ভাগ করে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বজনপ্রীতি, বৈষম্য এবং প্রভাবশালীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ। স্থানীয় ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করলেও মাঠের পরিস্থিতি নিয়ে কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
সার পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা
ভূরুঙ্গামারীর বিভিন্ন ইউনিয়নে ঘুরে দেখা গেছে, নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্রে কৃষকদের ভিড় রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী সার না পেয়ে অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন। বিশেষ করে আগাম সবজি চাষে ব্যস্ত কৃষকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নের দক্ষিণ ভরতেরছড়া গ্রামের কৃষক আবু বক্কর অভিযোগ করে বলেন, সার পাওয়ার জন্য একাধিকবার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘সারের জন্য ঘুরতে ঘুরতে জান শ্যাষ।’ তাঁর অভিযোগ, পরিচিতদের অগ্রাধিকার দিয়ে সার দেওয়া হচ্ছে, অথচ সাধারণ কৃষকেরা বারবার গিয়েও প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না।
গত বৃহস্পতিবার ১০ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষ্মীর মোড়ের নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়। সেখানে কেউ একাই এক বস্তা সার নিয়ে যাচ্ছিলেন, আবার কোথাও তিন-চারজন কৃষক মিলে একটি বস্তা নিচ্ছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, ওই সময় অন্তত দুইশ কৃষক সার না পেয়ে ফিরে যান।
বিক্রয়কেন্দ্রের সার বিক্রেতা মতিয়ার রহমান জানান, সেদিন তাঁদের কাছে মোট ৪০ বস্তা সার ছিল। এর মধ্যে ৩০ বস্তা ডিএপি এবং ১০ বস্তা টিএসপি। বিপরীতে কৃষকের সংখ্যা ছিল তিনশর বেশি। তাঁর দাবি, কয়েকজন মিলে একটি করে বস্তা নেওয়ার পরও সবার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। ওই ওয়ার্ডে আরও অন্তত দেড়শ বস্তা সার প্রয়োজন বলেও তিনি জানান। ইউরিয়া সার এক বস্তাও পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ইউনিয়নের ক্যাম্প মোড়ে বিসিআইসি অনুমোদিত এক ডিলারের প্রতিনিধি আবুল হাসেমও স্বীকার করেন, স্থানীয় চাহিদার তুলনায় তাঁরা পর্যাপ্ত সার পাচ্ছেন না।
আগাম সবজি চাষেও চাপ
দুধকুমার নদের গুনাইয়েরকুটি চরে এখন আগাম বেগুনের চাষ শুরু করেছেন কৃষকেরা। বিস্তীর্ণ চরজুড়ে চলছে জমি প্রস্তুত ও চারা লাগানোর কাজ। এ সময় গাছের বৃদ্ধি ও উৎপাদন ঠিক রাখতে বিভিন্ন ধরনের সার প্রয়োজন হলেও কৃষকেরা তা সহজে সংগ্রহ করতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেছেন।
গুনাইয়েরকুটি গ্রামের কৃষক মোজাম্মেল হক বলেন, ডিলার পয়েন্টে কৃষকদের ১০ কেজি করে সার দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে সবাই সমানভাবে সার পাচ্ছেন না। তাঁর অভিযোগ, কিছু ব্যক্তি টাকা দিয়ে কয়েক বস্তা করে সার সংগ্রহ করছেন, আর সাধারণ কৃষকদের একাধিকবার ঘুরেও সার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
কৃষকদের অভিযোগের আরেকটি দিক হলো মজুত। তাঁদের দাবি, প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি মৌসুমের প্রয়োজনীয় সার আগেই সংগ্রহ করে ঘরে রেখে দিয়েছেন। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সার পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের অভিযানে কয়েকটি জায়গা থেকে মজুত করা সার উদ্ধারের ঘটনাকে কৃষকেরা তাঁদের অভিযোগের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন।
বরাদ্দ ও চাহিদার হিসাব
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে কুড়িগ্রাম জেলায় ১ লাখ ২১ হাজার ১৭৫ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছে। সবজি আবাদ হয়েছে ২ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে। রবি মৌসুমের আগাম বেগুন চাষ হয়েছে ৩৪৫ হেক্টরে এবং এর পরিমাণ প্রতিদিন বাড়ছে। ফুলকপি ও বাঁধাকপি মিলিয়ে আবাদ রয়েছে প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে।
শুধু ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় রোপা আমনের আওতায় এসেছে ১৬ হাজার ৯০০ হেক্টর জমি। সবজি আবাদ হয়েছে ৪৪০ হেক্টরে। আগাম বেগুন চাষ হয়েছে ২৭৩ হেক্টর জমিতে, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ৬৯০ হেক্টর।
কৃষি কর্মকর্তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রতি হেক্টর রোপা আমনে ইউরিয়ার অনুমোদিত মাত্রা ১৯৫ কেজি। বেগুন ও ফুলকপির ক্ষেত্রে এই মাত্রা ২৬০ কেজি এবং বাঁধাকপিতে ৩৯০ কেজি।
এই হিসাব ধরে কুড়িগ্রামের আমন আবাদে ইউরিয়ার প্রয়োজন প্রায় ২৩ হাজার ৬২৯ টন। প্রায় ২০০ হেক্টর জমির ফুলকপি ও বাঁধাকপিতে প্রয়োজন প্রায় ৬৫ টন এবং ৩৪৫ হেক্টর বেগুনের জন্য প্রয়োজন প্রায় ৯০ টন ইউরিয়া। অর্থাৎ উল্লেখিত ফসলগুলোর জন্য মোট প্রয়োজন প্রায় ২৩ হাজার ৭৮৪ টন ইউরিয়া। শুধু ভূরুঙ্গামারীর আমন ও আগাম বেগুনের জন্য প্রয়োজন প্রায় ৩ হাজার ৩৬৫ টন ইউরিয়া।
অন্যদিকে কৃষি বিভাগের তথ্যে দেখা যায়, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে পুরো কুড়িগ্রাম জেলার জন্য ইউরিয়া বরাদ্দ হয়েছে ১২ হাজার ৪৮৩ টন। ভূরুঙ্গামারীর জন্য বরাদ্দ ১ হাজার ৪০৩ টন। কৃষকদের হিসাবে এটি মাঠের প্রয়োজনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
টিএসপির ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যবধানের কথা তুলে ধরেছেন কৃষকেরা। উল্লেখিত ফসলগুলোর জন্য জেলায় টিএসপির প্রয়োজন প্রায় ৬ হাজার ১৬৪ টন। আমনের জন্য ডিএপি প্রয়োজন প্রায় ১০ হাজার ৯০৫ টন। অথচ ওই তিন মাসে টিএসপি বরাদ্দ হয়েছে ২ হাজার ১০৪ টন এবং ডিএপি ৫ হাজার ৬৭ টন।
কৃষি বিভাগের ব্যাখ্যা ভিন্ন
তবে কৃষি বিভাগ এই ব্যবধানকে সরাসরি সারসংকট বা ঘাটতি হিসেবে দেখছে না। কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুনের বক্তব্য, কৃষকেরা অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার ব্যবহার করেন। তাঁর দাবি, বোরো মৌসুমে ব্যবহৃত নন-ইউরিয়া সারের একটি অংশ মাটিতে থেকে যায়। ফলে আমন মৌসুমে একই মাত্রায় নন-ইউরিয়া সার প্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে না।
তিনি আরও বলেন, একই জমিতে ডিএপি ব্যবহার করা হলে আলাদাভাবে টিএসপি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এ ক্ষেত্রে ইউরিয়ার প্রয়োজনও কিছুটা কমে। আমন মৌসুমে নিয়মিত বৃষ্টিপাত ও অনেক জমির উর্বরতার কারণেও কিছু জমিতে ইউরিয়ার প্রয়োজন কম হতে পারে বলে তাঁর ব্যাখ্যা।
অনুমোদিত মাত্রার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকার বিষয়টি ঘাটতি হিসেবে মানতে নারাজ এই কর্মকর্তা। তাঁর ভাষ্য, এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে বরাদ্দ ও ব্যবহার হয়ে আসছে। একই সঙ্গে ভূরুঙ্গামারীতে নিয়মিত বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত ইউরিয়া ও ডিএপি চাওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
ফলে একদিকে মাঠে সার না পাওয়ার অভিযোগ তুলে কৃষকেরা চাষাবাদ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, অন্যদিকে কৃষি বিভাগ বলছে অতিরিক্ত চাহিদার কারণেই পরিস্থিতিকে সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই দুই বক্তব্যের মাঝখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—সরকারি বরাদ্দ, অনুমোদিত প্রয়োগমাত্রা এবং বাস্তব মাঠচাহিদার মধ্যে সমন্বয় কতটা হচ্ছে। আমন ও আগাম সবজি চাষের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই ব্যবধানের প্রভাব কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও ফসলের ওপর কতটা পড়ে, সেটিও এখন দেখার বিষয়।


