স্মরণে—ওস্তাদ আয়েত আলী খান সুরবাহারের সুরে যিনি রেখে গেছেন অমলিন উত্তরাধিকার

উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীতের বিশাল ভুবনে কিছু শিল্পীর নাম কেবল ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকে না—তাঁদের সৃষ্ট সুর, সাধনা ও উত্তরাধিকার প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলে। ওস্তাদ আয়েত আলী খান ছিলেন তেমনই এক বিরল প্রতিভা। উচ্চাঙ্গসংগীতের নিবেদিতপ্রাণ সাধক, অসাধারণ সেতার ও সুরবাহার বাদক এবং সুরস্রষ্টা হিসেবে তিনি উপমহাদেশের সংগীতজগতে রেখে গেছেন তাঁর স্বতন্ত্র ছাপ।

১৮৮৪ সালের ২৬ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে এক ঐতিহ্যবাহী সাংগীতিক পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা সাবদার হোসেন খান এবং মাতা সুন্দরী বেগম। তিনি ছিলেন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের কিংবদন্তি সাধক ও ‘সুরসম্রাট’ ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁর ছোট ভাই। সংগীত যেন ছিল তাঁদের পারিবারিক উত্তরাধিকার; সেই উত্তরাধিকারকে নিজস্ব সাধনা, মেধা ও সৃষ্টিশীলতায় আরও সমৃদ্ধ করেছিলেন আয়েত আলী খান।

কণ্ঠসংগীতের পাশাপাশি যন্ত্রসংগীতে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা ছিল। বিশেষ করে সেতার ও সুরবাহার বাদনে তিনি অর্জন করেছিলেন অনন্য মর্যাদা। তাঁর বাজনায় ছিল গভীরতা, মাধুর্য ও শাস্ত্রীয় সংগীতের সূক্ষ্ম ব্যাকরণ মেনে চলার পাশাপাশি নিজস্ব সৃজনশীলতার অপূর্ব সমন্বয়।

শুধু প্রচলিত ধারার শিল্পী হিসেবেই তিনি থেমে থাকেননি; ছিলেন একজন উদ্ভাবক ও সুরস্রষ্টাও। তিনি ‘মনোহরা’ ও ‘মন্ত্রনাদ’ নামে দুটি নতুন বাদ্যযন্ত্র উদ্ভাবন করেন। পাশাপাশি ‘চন্দ্রসারং’-সহ বেশ কয়েকটি নতুন রাগ সৃষ্টির কৃতিত্বও তাঁর। অর্থাৎ তাঁর সাধনা ছিল শুধু সংগীত পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সংগীতের পরিসরকে নতুনভাবে বিস্তৃত করার মধ্যেও তিনি রেখে গেছেন সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর।

রাজদরবারের সংগীতচর্চার সঙ্গেও তাঁর ছিল গভীর সম্পর্ক। তিনি মাইহার ও রামপুর রাজ্যের রাজসংগীতজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি পৌঁছে গিয়েছিল শান্তিনিকেতনেও। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমন্ত্রণে তিনি শান্তিনিকেতনের সংগীত বিভাগে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময়ের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তাঁর উপস্থিতি বাংলা ও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের পারস্পরিক সংযোগকে আরও সমৃদ্ধ করেছিল।

১৯৫১ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান রেডিওতে নিয়মিত সুরবাহার পরিবেশন করেন। বেতারের মাধ্যমে তাঁর বাদন ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর শ্রোতৃসমাজে। তাঁর সুরের সাধনা তখন আর কেবল রাজদরবার, সংগীতসভা কিংবা সীমিত পরিসরের মধ্যে আবদ্ধ ছিল না—বেতারের তরঙ্গে তা পৌঁছে যায় অগণিত সংগীতপ্রেমীর ঘরে।

ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন এক বৃহৎ পরিবারের কর্তা। তাঁর এগারো সন্তান—আম্বিয়া খানম, ওস্তাদ আবেদ হোসেন খান, বাহাদুর হোসেন খান, মোবারক হোসেন খান, মমতা খানম, শেখ সাদী খান, তানসেন খান, ইয়াসমিন খানম, বিটোফেন খান, কোহিনূর খানম ও রিজিয়া বেগম। তাঁদের মধ্য থেকে অনেকে পরবর্তীকালে সংগীতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পারিবারিক সংগীত-ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যান। অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করায় শেষের দুই সন্তানের নাম পরবর্তী আলোচনায় তুলনামূলকভাবে কম এসেছে।

সংগীতে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিও এসেছে নানা সময়ে। ১৯৬০ সালে তিনি গভর্নর পদক লাভ করেন। ১৯৬৬ সালে অর্জন করেন ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স’ সম্মাননা। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর অবদানের যথার্থ মূল্যায়ন অব্যাহত থাকে—১৯৭৬ সালে শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৮৪ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার তাঁকে মরণোত্তরভাবে প্রদান করা হয়।

একজন শিল্পীর প্রকৃত জীবনকাল কখনোই তাঁর জন্ম ও মৃত্যুর তারিখের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শিল্পীর শরীরের অবসান ঘটে, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট সুর বেঁচে থাকে মানুষের স্মৃতিতে, শ্রুতিতে এবং সংস্কৃতির উত্তরাধিকারে। আয়েত আলী খানের ক্ষেত্রেও তাই। সেতারের তারে, সুরবাহারের গভীর অনুরণনে, তাঁর সৃষ্ট রাগ ও বাদ্যযন্ত্রের ঐতিহ্যে আজও যেন ফিরে আসে এক নিবেদিতপ্রাণ সাধকের সুরময় উপস্থিতি।

২ সেপ্টেম্বর ১৯৬৭ সালে এই কিংবদন্তি শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর সুরের মৃত্যু হয়নি। সময়ের প্রবাহে অনেক কিছু হারিয়ে যায়, অনেক নাম বিস্মৃতির অন্ধকারে মিলিয়ে যায়; অথচ সত্যিকারের শিল্পীর সৃষ্টি থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে—নিঃশব্দে, নিরন্তর।

বাংলার মাটিতে জন্ম নেওয়া এই মহান সংগীতসাধক ছিলেন আমাদের উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীতের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তাঁর জীবন ছিল সাধনার, তাঁর শিল্প ছিল সৃষ্টির, আর তাঁর উত্তরাধিকার আমাদের সংগীত-ঐতিহ্যের এক মূল্যবান সম্পদ।

সুরের এই মহান সাধকের প্রয়াণদিবসে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাঁকে স্মরণ করছি।

শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।