পুরাতন মনটাতে আর সয়না কোনো নতুন জ্বালাতন…
বাংলা গানের ভাণ্ডারে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাঁদের কণ্ঠ, সুর ও সৃষ্টিকর্ম আজও মানুষের হৃদয়ে অনুরণিত হয়, অথচ সময়ের প্রবাহে তাঁরা অনেকটাই বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছেন। তেমনই এক গুণী শিল্পী, সুরকার ও গীতিকার আনোয়ার উদ্দিন খান।
তিনি ছিলেন একাধারে সঙ্গীতশিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক ও গীতিকার। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেসিক ডিস্ক এবং চলচ্চিত্র—সব ক্ষেত্রেই তাঁর সৃজনশীল অবদান বাংলা সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর সুর, তাঁর কণ্ঠ এবং তাঁর লেখা অসংখ্য গান আজও শ্রোতাদের মনে নস্টালজিয়ার আবেশ জাগায়।
সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০০৫ সালে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করে।
১৯৩৫ সালের ৪ জুন রাজবাড়ী জেলায় তাঁর জন্ম। পিতা ছিলেন আকবর আলী খান। ১৯৫২ সালে মুসলিম হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৬১ সালে ব্যাংকের চাকরিতে যোগ দিলেও তাঁর প্রকৃত নিবাস ছিল সঙ্গীতের জগৎ। কর্মজীবনের পাশাপাশি তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে এবং ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন স্বতন্ত্র সঙ্গীতস্রষ্টা হিসেবে।
কবি ও গীতিকার আবু হেনা মোস্তফা কামাল-এর সঙ্গে তাঁর সৃজনশীল যুগলবন্দি বাংলা গানের ভাণ্ডারকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। চলচ্চিত্র অপরাজিতা ছিল তাঁর কণ্ঠে গাওয়া প্রথম চলচ্চিত্রের গান।
শুধু কণ্ঠশিল্পী হিসেবেই নয়, তিনি চলচ্চিত্রের সফল সঙ্গীত পরিচালক হিসেবেও নিজস্ব স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁর সুরারোপিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে বাল্যবন্ধু ও মায়ার সংসার। এছাড়া ময়নামতি চলচ্চিত্রেও তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন।
তাঁর লেখা ও গাওয়া বহু গান আজও বাংলা গানের অনুরাগীদের হৃদয়ে অম্লান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
‘লোকে বলে প্রেম’
‘পুরাতন মনটাতে আর সয়না কোনো নতুন জ্বালাতন’
‘কচি পাতার টিয়া রঙ’
‘জড়োয়া অলংকারে’
ব্যক্তিজীবনে তিনি সুলতান আরা বেগম (লিলি)-কে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে বরণ করেন। তাঁদের একমাত্র কন্যা আরজিনা খান টুম্পা।
২০০২ সালের ২ আগস্ট তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠ, তাঁর সুর এবং তাঁর সৃষ্টিগুলো আজও বাংলা গানের আকাশে অনির্বাণ দীপশিখার মতো জ্বলছে।
আজ তাঁর প্রয়াণদিবসে এই নিভৃতচারী সঙ্গীতসাধকের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র স্মরণ। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।



