স্মরণে—শিল্পের ক্যানভাসে ভিন্ন আঁচড় কাটা এক সৃজনশীল শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার

বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির আকাশে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের সৃষ্টিশীলতার পরিধি কোনো একটি মাধ্যমের সীমারেখায় আবদ্ধ থাকে না। তাঁরা একই সঙ্গে শিল্পী, শিক্ষক, নির্মাতা, গবেষক ও স্বপ্নদ্রষ্টা। মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন তেমনই এক বহুমাত্রিক প্রতিভা—যিনি ক্যানভাসের রঙ থেকে টেলিভিশনের পর্দা, পাপেটের মঞ্চ থেকে নাট্যশিল্পের নান্দনিক পরিসর—সবখানেই এঁকেছেন তাঁর নিজস্ব সৃজনের স্বাক্ষর।

বাংলাদেশের বিখ্যাত কবি গোলাম মুস্তাফার সুযোগ্য সন্তান মুস্তাফা মনোয়ার স্বনামে খ্যাত এক বরেণ্য চিত্রশিল্পী। শিল্পের প্রতি তাঁর সহজাত অনুরাগ ও অনুসন্ধিৎসু মন তাঁকে খুব অল্প বয়সেই সৃজনের জগতে নিয়ে আসে। কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফট থেকে চারুশিক্ষা গ্রহণের পর তিনি চিত্রকলাকে শুধু পেশা হিসেবে নয়, জীবনবোধ ও সমাজকে দেখার এক অনন্য ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেন।

চিত্রকলায় তাঁর নিজস্ব ভঙ্গি, রেখা, রং ও শনের স্বাতন্ত্র্য তাঁকে সমকালীন শিল্পীদের ভিড়ে আলাদা করে চিনিয়েছে। কিন্তু তাঁর সৃজনশীলতার সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি ছিল বাংলাদেশে পাপেট শিল্পের বিকাশ ও জনপ্রিয়ীকরণ। এ কারণেই তিনি মানুষের কাছে ভালোবাসায় পরিচিত হয়ে ওঠেন—‘বাংলাদেশের পাপেটম্যান’ নামে। লোককথা, রূপকথা ও বাংলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পাপেটের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের কাছে পৌঁছে দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক অভিনব শিল্পভাষা।

তাঁর সৃষ্ট পাপেট চরিত্র পারুল, বাঘা, মিনিসহ নানা চরিত্র একসময় বাংলাদেশের অসংখ্য শিশুর কল্পনার জগৎকে রাঙিয়ে দিয়েছিল। তাঁর জনপ্রিয় টেলিভিশন পাপেট অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’ দীর্ঘদিন দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। ‘সাত ভাই চম্পা’র মতো লোককথাকে আধুনিক টেলিভিশন মাধ্যমে নতুন প্রাণ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন—শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ রেখেও শিল্প হতে পারে আধুনিক, আকর্ষণীয় ও সময়োপযোগী।

বাংলাদেশের টেলিভিশন শিল্পের বিকাশেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান টেলিভিশনে প্রযোজক হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি পরবর্তীকালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রাথমিক বিকাশ ও নানা সৃজনশীল অনুষ্ঠান নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’-এর সঙ্গেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান জড়িয়ে আছে। নাটক নির্মাণেও তাঁর সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ এবং শেক্‌সপিয়রের ‘দ্য টেমিং অব দ্য শ্রু’-সহ বিভিন্ন নাট্যকর্মকে তিনি টেলিভিশনের ভাষায় রূপ দিয়েছেন।

শুধু শিল্পী বা নির্মাতা নন, মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ও শিল্পগুরু। তাঁর কাছে শিল্প ছিল কেবল প্রদর্শনের বিষয় নয়—শিল্প ছিল মানুষের মননকে জাগ্রত করার, সৌন্দর্যবোধকে পরিশীলিত করার এবং নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে শেখানোর এক শক্তিশালী মাধ্যম। বহু শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী তাঁর সান্নিধ্য ও শিক্ষা থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাঁর শিল্পীসত্তা নীরব থাকেনি। পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থী শিবিরগুলোতে পাপেট প্রদর্শনীর মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। তাঁর পাপেটনাটক ‘আগাছা’, ‘রাক্ষস’ ও ‘এক সাহসী কৃষক’ সেই সময়ের শিল্প-প্রতিবাদের স্মারক হয়ে আছে। পরবর্তীকালে তাঁর পাপেটশিল্পের কিছু দৃশ্য তারেক মাসুদের প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’-এও স্থান পায়।

শিল্পের বহুমুখী প্রয়োগে তাঁর সৃজনশীলতার আরও বহু নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। দ্বিতীয় সাফ গেমসের ‘মিশুক’ নির্মাণ এবং ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনে লাল সূর্যের প্রতিরূপ স্থাপনাসহ নানা নকশা ও পরিকল্পনায় তিনি রেখে গেছেন তাঁর স্বতন্ত্র শিল্পবোধের পরিচয়।

চারুকলা, পাপেট, টেলিভিশন, নাটক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিকল্পনা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন এক নিরন্তর অভিযাত্রী। তাঁর হাতে শিল্প কখনো নিছক বিনোদন হয়ে থাকেনি; বরং তা হয়ে উঠেছে মানুষের সঙ্গে মানুষের, ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার এবং কল্পনার সঙ্গে বাস্তবতার এক সেতুবন্ধন।

রাষ্ট্র তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছে একুশে পদক-এ। ২০০৪ সালে তিনি এই রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত হন। পরবর্তীকালে তিনি আজীবন সম্মাননাসহ আরও নানা পুরস্কার ও স্বীকৃতি লাভ করেন।

১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৫ সালে জন্ম নেওয়া এই সৃজনশীল শিল্পী ২০২৬ সালের ২৯ জুন সকালে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০/৯১ বছর—জন্মতারিখ ও মৃত্যুর সময় গণনার পদ্ধতি অনুযায়ী বিভিন্ন প্রতিবেদনে বয়সের সামান্য পার্থক্য দেখা যায়।

তাঁর চলে যাওয়া যেন বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির এক দীর্ঘ আলোকিত অধ্যায়ের অবসান। কিন্তু একজন সত্যিকারের শিল্পী কখনো তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়ে যান না। তাঁর আঁকা রেখায়, তাঁর সৃষ্ট চরিত্রে, তাঁর নির্মিত নাটকে, পাপেটের নড়াচড়ায়, তাঁর ছাত্রদের সৃষ্টিতে এবং অসংখ্য মানুষের স্মৃতিতে তিনি বেঁচে থাকবেন।

মুস্তাফা মনোয়ার চলে গেছেন—
কিন্তু তাঁর শিল্পের ক্যানভাসে রয়ে গেছে অমোচনীয় কিছু আঁচড়।
রয়ে গেছে স্বপ্ন দেখার সাহস, সৃষ্টির আনন্দ এবং শিল্পকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় স্মরণ করি এই শিল্পসারথিকে।

মুস্তাফা মনোয়ার—
শিল্পের ভুবনে আপনার ভিন্ন আঁচড়
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে চিরকাল অমলিন থাকবে।

শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Tags :

সৌরভ বিশ্বাস | উপ-সম্পাদক | খবরওয়ালা বাংলা

https://bn.khaborwala.com/

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।