যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান যুদ্ধের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। গত কয়েক দিনে এই নৌপথের আশপাশে একাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা, অগ্নিকাণ্ড ও জাহাজডুবির ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ওমান উপসাগরে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরিতে ইরান নতুন কৌশল নিচ্ছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করায় ওমান উপসাগরে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে আগুন ধরে যায়। ইরানের সামরিক বাহিনীর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, জাহাজটি নিজের অবস্থান শনাক্ত করার ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছিল এবং নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করছিল।
তবে ট্যাঙ্কারটিতে কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা নিশ্চিত করা যায়নি। এ ঘটনার পেছনে কারা জড়িত, সে বিষয়েও নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনা এবং ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ কার্যকরের দায়িত্বে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
তেলের বাজারে চাপ তৈরির কৌশল?
ইরানের সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে রাখার কৌশল নিতে পারে তেহরান। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির চেষ্টা হতে পারে বলে ওই প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মার্কিন প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
তবে হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে ইরানের কোনো সমন্বিত কৌশলের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জাহাজে হামলা, নৌপথে চলাচলে বাধা এবং সামরিক অবরোধের প্রভাব—প্রতিটি বিষয়ই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের জন্য এই নৌপথ ব্যবহৃত হয়। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে। পরিবহন ব্যয়, বিমা প্রিমিয়াম এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
অভ্যন্তরীণ সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন পেজেশকিয়ান
আন্তর্জাতিক চাপের পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর ইরান বর্তমানে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
পেজেশকিয়ানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জনগণের জীবনযাত্রা কঠিন করে তুলে দেশটির অভ্যন্তরে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে চায়। তাঁর মতে, অর্থনৈতিক চাপ, যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে মানুষের দুর্ভোগ বাড়লে তা সামাজিক বিক্ষোভের রূপ নিতে পারে। ওয়াশিংটন সেই পরিস্থিতিকে নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণে কাজে লাগাতে চাইছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘বিপ্লবের পর গত ৪৮ বছরে আমরা এখনকার মতো তীব্র অবরোধ, যুদ্ধ ও সংকটের মুখে কখনও পড়িনি।’
তিনি আরও বলেন, মানুষের ক্ষোভ বাড়ানো এবং তাদের দৈনন্দিন দুর্ভোগ তীব্র করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায়। তবে তাঁর এসব অভিযোগের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সংঘাতের প্রভাব সামরিক ক্ষেত্র ছাড়িয়ে বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় ছড়িয়ে পড়েছে।
হরমুজের কাছে দুটি বাণিজ্যিক জাহাজডুবি
হরমুজ প্রণালির আশপাশে সাম্প্রতিক জাহাজডুবির ঘটনাগুলো পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, গত মঙ্গলবার দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ পৃথক ঘটনায় ডুবে যায়। তাঁদের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজ দুটিতে ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো ধরনের গোলার মতো প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছিল। বুধবারের আগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জাহাজ দুটি ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
এর আগের ১০ দিনেও ওই নৌপথের আশপাশে জাহাজে হামলার ঘটনা বেড়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল এবং নাবিকদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ডুবে যাওয়া জাহাজ দুটির একটি সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী ‘জিএফএস প্রাইড’। জাহাজটি একটি ছোট আকারের কনটেইনারবাহী জাহাজ, যার ধারণক্ষমতা ছিল ২ হাজার ৮২৪ টিইইউ। টিইইউ হলো ২০ ফুট দীর্ঘ সমমানের কনটেইনারের ভিত্তিতে জাহাজের ধারণক্ষমতা পরিমাপের একক।
সিঙ্গাপুরের মেরিটাইম অ্যান্ড পোর্ট অথরিটি বুধবার এক বিবৃতিতে জানায়, গত মঙ্গলবার জাহাজটিতে হামলার পর আগুন ধরে যায়। পরে সেটি ডুবে যায়। তবে জাহাজে থাকা ২১ জন ক্রুকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। তাঁদের প্রাণহানি এড়ানো গেলেও জাহাজটির ক্ষয়ক্ষতি এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
‘কেপ ডাও’ ডুবল প্রাণহানির ঘটনার পর
অন্য জাহাজটি অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার পতাকাবাহী ‘কেপ ডাও’। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাহাজটিতে একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। ওই ঘটনায় একজন ক্রু নিহত হন। জাহাজে থাকা অন্যদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে জাহাজটি হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি ডুবে যায়। জাহাজটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পিওনিজ শিপম্যানেজমেন্ট এফজেডই। জাহাজডুবির খবরের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
আইএমওর সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে জাহাজডুবির ঘটনাগুলো নথিভুক্ত করা হচ্ছে। সেই হিসাব অনুযায়ী, ‘জিএফএস প্রাইড’ ও ‘কেপ ডাও’ যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় জাহাজডুবির ঘটনা।
সামুদ্রিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বাড়তি ঝুঁকি
হরমুজ প্রণালিতে ধারাবাহিক হামলা ও জাহাজডুবির ঘটনা শুধু সংশ্লিষ্ট জাহাজের মালিক বা নাবিকদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে না; এর প্রভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও পড়তে পারে। নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়ে গেলে জাহাজ চলাচলের রুট পরিবর্তন, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামুদ্রিক বিমার খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এসব ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্য ও জ্বালানির দামের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
একই সঙ্গে নৌপথটিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হলে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল, হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলা ও জাহাজডুবি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর দায় কার, ইরানের নতুন কোনো সমন্বিত কৌশল কার্যকর হচ্ছে কি না এবং যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।


