১৪ কোটি টাকার সড়কে ঢালাইয়ের পরই ফাটল

দীর্ঘদিনের খানাখন্দ পেরিয়ে নতুন সড়কের প্রত্যাশা ছিল রাজশাহীর পবা ও তানোর উপজেলার মানুষের। সেই প্রত্যাশা পূরণে প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হয়েছে সড়ক পুনর্বাসনের কাজ। কিন্তু কাজ শুরুর কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে নির্মাণের মান নিয়ে। সড়কের যেসব অংশে আরসিসি ঢালাই দেওয়া হয়েছে, তার কিছু জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও আবার ঢালাই করা অংশ দেবে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সড়ক নির্মাণের আগে নিচের মাটি যথাযথভাবে শক্ত বা কমপ্যাক্ট করা হয়নি। কোথাও অপরিষ্কার ও দুর্বল মাটির ওপরই কাজ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁদের। রোলার যথাযথভাবে চালানো হয়নি এবং কিছু জায়গায় নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে—এমন দাবিও করেছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। তাঁদের আরও অভিযোগ, ঢালাইয়ের পুরুত্ব কম এবং নির্মাণে বালুর পরিমাণ বেশি, বিপরীতে খোয়া ও রড ব্যবহারে ঘাটতি রয়েছে।

তবে স্থানীয়দের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পবা উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী। তাঁর দাবি, নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে সমস্যা নেই। সড়কের নিচের মাটি ‘অর্গানিক সয়েল’ হওয়ায় পানি পেলে এর ভার বহনের সক্ষমতা কমে যায়। ফলে ওপরের কাঠামোর চাপ সামলাতে না পেরে মাটি দেবে যাচ্ছে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও ভারী যানবাহন চলাচলও ঢালাই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ হতে পারে বলে তিনি জানান।

৯ কিলোমিটারের বেশি সড়ক পুনর্বাসন

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, ‘বায়া-কাশিম বাজার-তানোর সড়ক পুনর্বাসন কাজ (প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ)’ প্রকল্পের আওতায় পবা থেকে তানোরের দিকে ৯ কিলোমিটারের বেশি সড়ক পুনর্বাসনের কাজ চলছে। প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য প্রায় ১৪ কোটি টাকা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় গত ৯ মে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালের ১২ মার্চ।

প্রকল্পের আওতায় সড়ক প্রশস্ত ও শক্তিশালী করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অংশে আরসিসি ঢালাই দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে পবা উপজেলার বাকসাড়া-নওদাপাড়া এলাকায় প্রায় আধা কিলোমিটার অংশে ঢালাই দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু সেই ঢালাইয়ের বিভিন্ন জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। কিছু অংশে সড়ক বসে যাওয়ার চিহ্নও রয়েছে। ফাটল ধরা জায়গায় কাজ বন্ধ রাখা হলেও প্রকল্পের অন্য অংশে নির্মাণকাজ চলতে দেখা গেছে।

১৭ সেপ্টেম্বর সকালে সরেজমিনে বায়া থেকে তানোরের আগপর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন অংশ ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়। নির্মাণাধীন অংশে শ্রমিকদের কাজ করতে দেখা গেলেও যেসব জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে, সেখানে কাজ বন্ধ ছিল।

‘নিচের মাটি শক্ত করা হয়নি’

বাকসাড়া-নওদাপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. কুরবান আলীর অভিযোগ, কিছু জায়গায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা না করেই ঢালাই দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, সড়কের নিচের মাটিও যথাযথভাবে শক্ত করা হয়নি। তিনি ফাটল ধরা অংশ তুলে নিচের মাটি শক্ত করে নতুন করে ঢালাই দেওয়ার দাবি জানান।

ওই এলাকার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. নাজমুল হুদা মোল্লার অভিযোগ, গর্ত খননের পর মাটি ভালোভাবে কমপ্যাক্ট করা হয়নি। রোলার যথাযথভাবে ব্যবহার না করায় একদিকে সড়ক বসে গেছে, অন্যদিকে ফাটল দেখা দিয়েছে। কাজের মান নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দাবি, ঢালাইয়ের পুরুত্ব কম এবং বালুর পরিমাণ বেশি; খোয়া তুলনামূলক কম ব্যবহার করা হয়েছে।

স্থানীয় কৃষক মো. আব্দুস সালামও নির্মাণকাজ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। মাঠে কাজ করার সময় তিনি সড়ক নির্মাণের কাজ দেখেছেন জানিয়ে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি টেকসইভাবে নির্মাণ করা দরকার।

আরেক বাসিন্দা আব্দুল জলিলের ভাষ্য, কাজ শেষ হওয়ার পরপরই বিভিন্ন জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, এভাবে নির্মাণ করা হলে সড়কটি দীর্ঘদিন টিকবে না।

মো. সিরাজুল ইসলাম অভিযোগ করেন, সড়কের বিভিন্ন স্থানে ইট ও রড ব্যবহারের কাজ যথাযথ হয়নি। নির্মাণ শেষ হওয়ার এক মাসের মধ্যেই ফাটল দেখা দেওয়ায় তিনি কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

কম্প্যাকশন ও ভাইব্রেশন নিয়েও প্রশ্ন

বাকসাড়া-নওদাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. হাবিবুর রহমান জানান, নির্মাণকাজের সময় তিনি একজন প্রকৌশলীকে সড়কের মাটি শক্ত করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, নিচের মাটি যথেষ্ট শক্ত করা হয়নি। ঢালাই দেওয়ার সময় প্রয়োজনীয় কম্প্যাকশন বা ভাইব্রেশনের জন্য যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।

নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে রাস্তার নিচের স্তরের মাটি যথাযথভাবে প্রস্তুত করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওপরের ঢালাই বা পেভমেন্টের ভার শেষ পর্যন্ত নিচের স্তরগুলোর ওপরই পড়ে। নিচের স্তর দুর্বল থাকলে পানি ঢোকা, অতিরিক্ত চাপ কিংবা যানবাহনের ভারে বসে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে এই সড়কের ক্ষেত্রে স্থানীয়দের অভিযোগগুলো বাস্তবে কতটা সত্য, তা নির্ধারণে প্রকৌশলগত পরীক্ষা ও নথিপত্র যাচাই প্রয়োজন।

প্রকৌশলীর ব্যাখ্যা, মাটিই বড় সমস্যা

স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে পবা উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী বলেন, নির্মাণসামগ্রীর মানে কোনো সমস্যা নেই। সড়কের নিচের মাটি ‘অর্গানিক সয়েল’ হওয়ায় পানি পেলে এর ভার বহনের সক্ষমতা কমে যায়। এতে ওপরের অংশের চাপ সামলাতে না পেরে মাটি বসে যেতে পারে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং সড়কে ভারী যানবাহনের চলাচল পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে। বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় প্রকল্পের নকশা সংশোধনের জন্য আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

মোহাম্মদ আলী বলেন, মাটির বেয়ারিং ক্যাপাসিটি, বৃষ্টির পানি এবং ভারী যানবাহনের চাপ বিবেচনায় নিয়ে সড়কের কাঠামো আরও শক্তিশালী করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী ৩ ইঞ্চি সিসি ঢালাইয়ের পাশাপাশি ১২ ইঞ্চি আরসিসি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে দুই স্তরের রডের জালি এবং কর্নার বার বা কর্নার রড ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে।

প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বিষয়টি অবগত আছেন এবং সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখে গেছেন বলেও জানান তিনি। তাঁর দাবি, কাজ নিয়ম মেনেই করা হয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ঠিকাদারের বক্তব্য, ‘২৮ দিন ভারী যান চলাচল বন্ধ রাখা দরকার’

কাজের মান নিয়ে ওঠা প্রশ্নের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জুয়েল ইলেকট্রনিক্সের ঠিকাদার মো. ইউনুস আলীও ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ঢালাই দেওয়ার পর অন্তত ২৮ দিন ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ঢালাই করা অংশের ওপর দিয়েই ভারী যানবাহন চলাচল করেছে। এতে নতুন ঢালাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে।

তবে ঠিকাদারের বক্তব্যের আরেকটি অংশ স্থানীয় প্রকৌশলীর ব্যাখ্যার সঙ্গে কিছুটা মিলে যায়। ইউনুস আলী বলেন, ওই এলাকার মাটি ভালো নয়। এ কারণে এমন পরিস্থিতিতে কাজ করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে আপত্তি জানানো হয়েছিল। তাঁর দাবি, সেই আপত্তি আমলে নেওয়া হয়নি।

এখন প্রশ্ন হলো, প্রায় ১৪ কোটি টাকার এই প্রকল্পে নির্মাণের শুরুতেই যে ফাটল দেখা দিয়েছে, তার প্রকৃত কারণ কী। এটি কি মাটির স্বাভাবিক দুর্বলতা, অতিরিক্ত বৃষ্টির প্রভাব ও ভারী যানবাহনের চাপ, নাকি নির্মাণের কোনো ধাপে ত্রুটি ছিল—তা নির্ধারণের জন্য প্রকৌশলগত পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ফলে ত্রুটিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, সড়কটি যেন শুধু প্রকল্পের সময়সীমার মধ্যে নির্মাণ শেষ করার লক্ষ্যেই না থাকে; বরং দীর্ঘদিন ব্যবহারের উপযোগী ও নিরাপদ সড়ক হিসেবেই তৈরি হয়।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।