২১ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বেড়ে ২ লাখ ৯৪ হাজার কোটি

ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ এবং লোকসানের চাপ—সব মিলিয়ে দেশের ব্যাংক খাতের মূলধন পরিস্থিতি আরও দুর্বল হয়েছে। চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিক শেষে ২১টি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর প্রান্তিকে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা।

কিছু ব্যাংকের মূলধন উদ্বৃত্ত থাকায় সামগ্রিক হিসাবে ঘাটতির একটি অংশ সমন্বয় হয়েছে। এরপরও মার্চ শেষে দেশের ৬১টি ব্যাংকের নিট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে এই ঘাটতি ছিল ২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে মাত্র তিন মাসে ব্যাংক খাতের সার্বিক নিট মূলধন ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা।

ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, মূলধন ঘাটতির এই চিত্র ব্যাংক খাতের একটি বড় অংশের আর্থিক দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি। কোনো ঋণ খেলাপি হলে সেই ঋণের বিপরীতে নির্ধারিত হারে প্রভিশন রাখতে হয়। খেলাপি ঋণের পরিমাণ যত বাড়ে, প্রভিশনের প্রয়োজনও তত বাড়ে। এতে ব্যাংকের আয় ও মুনাফার ওপর চাপ পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত মূলধন ভিত্তি দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, খেলাপি ঋণ বাড়লে মূলধন ঘাটতিও বাড়তে থাকে। কারণ, খেলাপি ঋণের বিপরীতে উচ্চহারে প্রভিশন রাখতে হয়। এতে মুনাফা কমে যায় এবং লোকসান হলে মূলধন ঘাটতি আরও বাড়ে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে এই ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৯৮ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। মূল প্রতিবেদনে জুন শেষে প্রভিশন ঘাটতি ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকায় পৌঁছানোর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মার্চ প্রান্তিকের তথ্যের সঙ্গে জুনের তথ্যের সময়গত ব্যবধান থাকায় এ পরিসংখ্যানকে পরবর্তী প্রান্তিকের হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের আগ্রাসী ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদনের মতো প্রবণতা বর্তমান সংকটকে আরও জটিল করেছে। এর সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণে। মার্চ শেষে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্যই ঝুঁকির কারণ হতে পারে। মূলধন দুর্বল হলে আমানতকারীদের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সম্পর্কে অনাস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একটি ব্যাংকের দুর্বলতা অন্য ব্যাংকেও আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ২০ থেকে ২১টি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে থাকার বিষয়টিও খাতটির কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা পরিমাপের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো ক্যাপিটাল-টু-রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও বা সিআরএআর। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতের সিআরএআর আরও কমে ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমেছে। ডিসেম্বর শেষে এই হার ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫ শতাংশ সিআরএআর বজায় রাখার কথা। ফলে বর্তমান অবস্থান নির্ধারিত মানের তুলনায় বড় ধরনের ঘাটতি নির্দেশ করছে।

এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল আলম খান বলেন, প্রয়োজনীয় মূলধন ও সিআরএআর বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে ব্যাংকগুলোকে নানা ধরনের বিধিনিষেধের মুখে পড়তে হতে পারে। এর মধ্যে লভ্যাংশ ও প্রণোদনা বোনাসে নিষেধাজ্ঞা, আমানতকারীদের আস্থা কমে যাওয়া, অর্থায়ন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মুনাফা সংকুচিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

মার্চ শেষে সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির ঘাটতি ৬৬ হাজার ২৬৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এরপর রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক। তাদের ঘাটতির পরিমাণ যথাক্রমে ৩১ হাজার ৬৮৭ কোটি ১৭ লাখ, ৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি ৬৭ লাখ, ৩০ হাজার ৫৯৪ কোটি ৫৬ লাখ এবং ৩০ হাজার ৩০২ কোটি ২৩ লাখ টাকা।

এ ছাড়া জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ১৮ হাজার ৩৫৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৬ হাজার ২৯৭ কোটি ৬১ লাখ, ন্যাশনাল ব্যাংকের ১১ হাজার ৯৮৪ কোটি ৯৮ লাখ, এবি ব্যাংকের ৮ হাজার ৪৮৭ কোটি ৫৯ লাখ এবং অগ্রণী ব্যাংকের ৮ হাজার ২৩৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

ব্যাংক খাতের মূলধন ঘাটতি পূরণে শুধু নতুন মূলধন জোগানই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ অনুমোদন ও তদারকিতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করাও জরুরি। কারণ, নতুন মূলধন দিয়ে ঘাটতি সাময়িকভাবে পূরণ করা গেলেও খেলাপি ঋণ ও পরিচালনাগত দুর্বলতা অব্যাহত থাকলে একই সংকট আবারও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।