ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ আবারও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আলোচনায় উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ও পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিদ্যমান নিয়মকানুন উপেক্ষা করে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রেখেছে। দেশটি ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে বলেও দাবি করেছে ওয়াশিংটন।
নিরাপত্তা পরিষদের এক বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেন, ইরান তার বিতর্কিত পরমাণু কর্মসূচি থেকে সরে আসার বিষয়ে আন্তর্জাতিক আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে না। তাঁর দাবি, তেহরানের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের পেছনে বিশ্বাসযোগ্য বেসামরিক উদ্দেশ্যের প্রমাণ যুক্তরাষ্ট্র দেখতে পাচ্ছে না।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা পরমাণু কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাধারণত বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানিতে তুলনামূলকভাবে কম মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে, উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পরমাণু অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রেও ব্যবহারযোগ্য হতে পারে। তবে কোনো দেশ নির্দিষ্ট মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন করছে—এ তথ্য একাই পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয় না। এ কারণেই ইরানের কর্মসূচির উদ্দেশ্য ও প্রকৃতি যাচাইয়ে আন্তর্জাতিক পরিদর্শন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মাইক ওয়াল্টজ আরও অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে প্রবেশ ও প্রয়োজনীয় পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তেহরানের সহযোগিতার ঘাটতির কারণে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, ইরানের ধারাবাহিক নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই আইএইএর বোর্ড অব গভর্নরস বিষয়টি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আলোচনায় পাঠিয়েছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে ইরানকে পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করার জন্য আলোচনায় বসার আহ্বান জানানো হলেও তেহরান সেই চাপ প্রত্যাখ্যান করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরানের বক্তব্য, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বেসামরিক প্রয়োজনেই পরিচালিত হচ্ছে। দেশটির কর্মকর্তারা আরও দাবি করেন, পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটির অধীনে শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার ইরানের রয়েছে। সেই অধিকারের অংশ হিসেবেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালানো হচ্ছে বলে তেহরানের অবস্থান।
ইরান একই সঙ্গে আইএইএর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। সংস্থাটির সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাবকে ইরানি কর্মকর্তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেছেন। তাদের অভিযোগ, আইএইএর কার্যক্রমে পশ্চিমা দেশগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানের প্রভাব রয়েছে এবং সংস্থাটি ইরানের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক অবস্থান নিচ্ছে।
ফলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন দুটি বিষয়—ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের সুযোগ। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের কর্মকাণ্ডে সম্ভাব্য পরমাণু অস্ত্র তৈরির ঝুঁকি দেখছে। অন্যদিকে তেহরান বলছে, তাদের কর্মসূচির লক্ষ্য শান্তিপূর্ণ এবং এনপিটির আওতায় নিজেদের অধিকার প্রয়োগ করতেই তারা পারমাণবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আবারও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।


