ভারতের মহারাষ্ট্রের রাজনীতি ও জনমনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে। রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ারকে বহনকারী একটি চার্টার্ড বিমান পুনে জেলার বারামতি বিমানবন্দরের কাছে বিধ্বস্ত হয়েছে। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বিমানে থাকা আরোহীরা, যার মধ্যে অন্যতম ছিলেন তরুণ বিমানবালা পিংকি মালি। মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে বাবার সাথে তাঁর শেষ কথোপকথন এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে এক হৃদয়বিদারক আখ্যানে পরিণত হয়েছে।

পিংকি মালির শেষ আকুতি

মুম্বাইয়ের ওরলি এলাকার বাসিন্দা পিংকি মালি ছিলেন তাঁর পরিবারের আশার আলো। বুধবার সকালে শেষবারের মতো যখন তিনি তাঁর বাবা শিবকুমারকে ফোন করেন, তখন তাঁর কণ্ঠে ছিল পেশাগত দায়িত্বের ব্যস্ততা। তিনি বলেছিলেন, “বাবা, আমি অজিত পাওয়ারের সঙ্গে বারামতি যাচ্ছি। তাঁকে নামিয়ে দিয়ে আমি নান্দেদে যাব। কাল কথা হবে।” বাবা শিবকুমারও মেয়েকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, কাজ শেষ করে পরের দিন কথা বলতে। কিন্তু সেই ‘পরের দিন’ আর পিংকির জীবনে আসেনি। শোকাতুর বাবা আজ বিলাপ করে বলছেন, তাঁর মেয়ের মরদেহ যেন মর্যাদার সঙ্গে শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়।

দুর্ঘটনার কালানুক্রম ও আরোহীদের পরিচয়

দিল্লির ‘ভিএসআর ভেঞ্চারস’-এর মালিকানাধীন লিয়ারজেট ৪৫ (ভিটি-এসএসকে) বিমানটি অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে রাডার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিচে দুর্ঘটনার সময়সূচি ও আরোহীদের তালিকা তুলে ধরা হলো:

বিষয় বিস্তারিত তথ্য
উড্ডয়ন সময় সকাল ৮টা ১০ মিনিট (মুম্বাই থেকে)
রাডার বিচ্ছিন্ন সকাল ৮টা ৪৫ মিনিট
বিধ্বস্তের সময় সকাল ৮টা ৫০ মিনিট
দুর্ঘটনার স্থান বারামতি বিমানবন্দরের নিকটবর্তী এলাকা, পুনে
আরোহী ১ অজিত পাওয়ার (মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী)
আরোহী ২ বিদীপ যাদব (ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা)
আরোহী ৩ পিংকি মালি (বিমানবালা)
আরোহী ৪ সুমিত কাপুর (প্রধান পাইলট)
আরোহী ৫ শাম্ভবী পাঠক (সহ-পাইলট)

দুর্ঘটনার কারণ ও তদন্ত প্রক্রিয়া

প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবতরণের ঠিক আগ মুহূর্তে বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং সজোরে মাটিতে আছড়ে পড়ে। আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি মহারাষ্ট্রে জেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেই নির্বাচনের প্রচারণায় পুনে জেলায় চারটি জনসভায় যোগ দিতে যাচ্ছিলেন অজিত পাওয়ার। দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় জরুরি উদ্ধারকারী দল ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান।

ভারতের কেন্দ্রীয় বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয় এই ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। বুধবারই দিল্লি থেকে ‘এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো’র (এএআইবি) একটি বিশেষজ্ঞ দল পুনের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। তারা বিমানের ব্ল্যাক বক্স এবং যান্ত্রিক ত্রুটির দিকগুলো খতিয়ে দেখবে। বিশেষ করে লিয়ারজেট ৪৫-এর মতো আধুনিক বিমানে কেন এ ধরনের যান্ত্রিক গোলযোগ ঘটল, তা নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করা হবে।

একদিকে একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার প্রয়াণ, অন্যদিকে পিংকি মালির মতো তরুণ পেশাজীবীদের অকাল মৃত্যু—সব মিলিয়ে মহারাষ্ট্রের আকাশ আজ শোকাচ্ছন্ন। সরকারের পক্ষ থেকে হতাহতদের পরিবারের জন্য বিশেষ ক্ষতিপূরণ এবং তদন্তের স্বচ্ছতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *