বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় ইস্যুকৃত প্রায় ১০ হাজার লাইসেন্সধারী আগ্নেয়াস্ত্র নির্ধারিত সময়ের মধ্যেও জমা না পড়ায় সেগুলো দ্রুত উদ্ধার ও বাজেয়াপ্ত করার জন্য জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বুধবার (৬ মে) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক সম্মেলনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত কার্য-অধিবেশন শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি সরকারের এই দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান।
অস্ত্র জমা না দেওয়ায় কঠোর আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বৈধ ও অবৈধ লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। তবে সেই নির্ধারিত সময়সীমা অতিবাহিত হওয়ার পরও একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্ত্র এখনও জমা পড়েনি।
মাঠ প্রশাসনকে এই বিষয়ে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, যেসব অস্ত্র এখনও জমা দেওয়া হয়নি, সেগুলো দ্রুত উদ্ধার করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া অনুসরণের জন্য তিনি ডিসিদের নির্দেশনা দেন।
লাইসেন্স যাচাই-বাছাই ও বাতিল প্রক্রিয়া
২০০৯ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালে রাজনৈতিক বিবেচনায় কিংবা বিদ্যমান নীতিমালা ও বিধি-বিধান উপেক্ষা করে যেসব অস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে, সেগুলো বাতিলের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। জেলা পর্যায়ের বিশেষ কমিটি এই দীর্ঘ সময়ে ইস্যুকৃত লাইসেন্সগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করবে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো লাইসেন্সে ত্রুটি বা অনিয়ম শনাক্ত হলে এবং তা প্রমাণিত হলে, সংশ্লিষ্ট আগ্নেয়াস্ত্রটি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করা হবে।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, ২০০৯ সালের পূর্বে যেসব নাগরিক সম্পূর্ণ বৈধ উপায়ে এবং বিধি মোতাবেক অস্ত্রের লাইসেন্স লাভ করেছিলেন, তারা নিয়ম অনুযায়ী যাচাই-বাছাই শেষে তাদের অস্ত্র ফেরত পাবেন।
জেলা প্রশাসক সম্মেলনে গৃহীত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মূল নির্দেশনাসমূহ
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জেলা প্রশাসকদের ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে। নিচে এই সংক্রান্ত মূল নির্দেশনাসমূহ একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | প্রধান ক্ষেত্র | গৃহীত সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা |
| ১ | অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার | প্রায় ১০ হাজার জমা না পড়া অস্ত্র উদ্ধার, লাইসেন্স বাতিল এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের। |
| ২ | মাদক নিয়ন্ত্রণ | মাদকের বিস্তার রোধ ও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ। |
| ৩ | চাঁদাবাজি রোধ | জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী সকল প্রকার চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন। |
| ৪ | অনলাইন জুয়া | অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে অর্থ পাচার ও সামাজিক অবক্ষয় ঠেকাতে নতুন আইন প্রণয়নের কাজ পরিচালনা। |
| ৫ | যৌথ সমন্বয় | আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠ পর্যায়ে পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত কাজের পরিধি বৃদ্ধি। |
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উল্লেখ করেন যে, দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং সমাজে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। বিশেষ করে অনলাইন জুয়ার বিস্তার রোধে সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে, কারণ এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে এবং সামাজিক অবক্ষয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অপরাধ দমনে সরকার নতুন আইন প্রণয়নের কাজও শুরু করেছে।
মাঠ পর্যায়ের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পারস্পরিক সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করার আহ্বান জানান মন্ত্রী। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের কোনো স্তরেই কোনো ধরনের শিথিলতা বা অবহেলা বরদাশত করা হবে না। দেশের সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও জনস্বস্তি ফিরিয়ে আনতে অবৈধ এবং অনিয়মিত অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত ও বিশেষ অভিযান দেশব্যাপী অব্যাহত থাকবে।



