খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশের জন্য নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হচ্ছে আগামীকাল। সংস্থাটির বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং দল বাংলাদেশ সফরে এসে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে অংশ নেবে।
এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো সরকারের চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচির অগ্রগতি পর্যালোচনা করা এবং নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত প্রস্তুতি ও সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থার মূল্যায়ন করা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং আর্থিক খাতের সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়ে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশের জন্য নতুন একটি ঋণ কর্মসূচি চালু করতে পারে আইএমএফ।
সরকার আশা করছে, নতুন কর্মসূচির আওতায় তিন বছরের জন্য ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ পাওয়া যেতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই অর্থ দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ মোকাবিলা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে ব্যবহার করা হবে। এ লক্ষ্যেই গত ৯ জুন অর্থমন্ত্রী আইএমএফের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ঋণ কর্মসূচির আবেদন জানিয়ে চিঠি পাঠান।
চিঠিতে সরকার উল্লেখ করে যে, আগের ঋণ কর্মসূচি গ্রহণের সময় দেশের অর্থনৈতিক ও নীতিগত বাস্তবতা যে রকম ছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার থেকে অনেকটাই ভিন্ন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক অর্থনীতির পরিবর্তন এবং নতুন আর্থিক চ্যালেঞ্জের কারণে কিছু সংস্কার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে সরকার সংস্কার কর্মসূচি থেকে সরে আসার কোনো পরিকল্পনা করছে না; বরং দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে সেগুলো বাস্তবায়নের কৌশল অনুসরণ করতে চায়।
আসন্ন বৈঠকগুলোতে প্রায় পুরো অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। বিশেষ করে সদ্য ঘোষিত ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিভিন্ন কর ছাড়ের যৌক্তিকতা, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঘাটতির কারণ, আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থার সংস্কারের অগ্রগতি, কর-ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনা গুরুত্ব পাবে।
ব্যাংকিং খাতও আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে উঠে আসবে। খেলাপি ঋণ কমানোর কৌশল, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন ও অবসায়ন কার্যক্রমের অর্থায়ন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর স্বাধীনতা এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থার অগ্রগতি নিয়ে আইএমএফ প্রতিনিধিদল বিস্তারিত মূল্যায়ন করবে। আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এসব বিষয়ে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়েছে, সেটিও আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
এর পাশাপাশি রাজস্ব আদায় প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ার কারণ, সরকারি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপ, বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের নীতি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা এবং ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়েও আলোচনা হবে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবসম্মত, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অর্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যয় করা হচ্ছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও আইএমএফ প্রতিনিধিদল জানতে চাইবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা ও সংস্কারের বাস্তব অগ্রগতিও মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সফর কেবল একটি নিয়মিত পর্যালোচনা নয়; বরং বাংলাদেশের আগামী কয়েক বছরের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তৈরির ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। প্রতিনিধিদলের মূল্যায়ন ইতিবাচক হলে পরবর্তী পর্যায়ে নতুন ঋণ কর্মসূচির পূর্ণাঙ্গ আলোচনা শুরু হবে। সেই পর্যায়ে ঋণের চূড়ান্ত পরিমাণ, কিস্তিভিত্তিক অর্থ ছাড়ের সময়সূচি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কার শর্ত নির্ধারণ করা হবে।
অন্যদিকে, যদি আইএমএফ মনে করে যে সংস্কার কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি, তাহলে আলোচনা দীর্ঘায়িত হতে পারে অথবা নতুন ঋণ কর্মসূচির শর্ত আরও কঠোর হতে পারে। ফলে আগামী কয়েক দিনের বৈঠকগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার, আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।