আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০ নিয়মের বড় পরিবর্তন

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম পরিবর্তন। খেলার গতি বাড়ানো, অযথা সময় নষ্ট ঠেকানো, ক্রিকেট বলের মাপ ও ওজনের মান নির্দিষ্ট করা এবং ফিল্ডিংয়ের কিছু জটিল পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্তের ভিত্তি স্পষ্ট করাই এসব পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য।

নতুন নিয়মগুলো ১ অক্টোবর বা এর পর শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক সিরিজে প্রযোজ্য হবে। এর আগে শুরু হয়ে যাওয়া কোনো সিরিজ পুরোনো নিয়মেই শেষ হবে। আসন্ন অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ সিরিজও নতুন নিয়মের আওতায় পড়বে।

পুরুষ ও নারী—উভয় ক্রিকেটের সব আন্তর্জাতিক ফরম্যাটেই সংশোধিত বিধান কার্যকর হয়েছে। একই সঙ্গে মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবের (এমসিসি) ক্রিকেট আইনে ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া পরিবর্তনগুলোও নতুন আন্তর্জাতিক playing conditions-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

আইসিসি পুরুষ ক্রিকেট কমিটির সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলী জানিয়েছেন, সংশোধনগুলোর মধ্যে ক্রিকেট বল, ফিল্ডিং এবং ম্যাচের গতি বাড়ানোর বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আধুনিক ক্রিকেটের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে, তবে খেলার সততা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

১. ব্যাটারের দেরিতে ৫ রান পাবে ফিল্ডিং দল

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাটার পরবর্তী বল মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত না থাকলে এখন থেকে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রথমবার সতর্ক করা হবে। দ্বিতীয়বার দেওয়া হবে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা।

তৃতীয়বার একই ঘটনা ঘটলে এবং এরপর প্রতিবার এমন হলে ফিল্ডিং দল ৫ রান করে পাবে। নিয়মটি বারবার লঙ্ঘন করা হলে আচরণবিধির আওতায়ও ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

এই পরিবর্তনের লক্ষ্য মূলত দুই বলের মধ্যবর্তী সময়ে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব কমানো। বিশেষ করে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে সময় ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই বিধান ম্যাচের গতি ধরে রাখতে ভূমিকা রাখবে।

২. নারী ও জুনিয়র ক্রিকেটে বলের আলাদা মান

নারী ও জুনিয়র ক্রিকেটে ব্যবহৃত বলের মাপ ও ওজন নিয়ে নতুন করে নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগে কিছু ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারকেরা নারী ও জুনিয়র ক্রিকেটের জন্য একই ধরনের বল তৈরি করতেন।

নতুন ব্যবস্থায় পুরুষ, নারী ও জুনিয়র ক্রিকেটের জন্য বলের মাপ ও ওজনের পৃথক মান থাকবে। এতে বিভিন্ন পর্যায়ের ক্রিকেটে ব্যবহৃত সরঞ্জামের বৈশিষ্ট্য আরও স্পষ্ট হবে এবং বল নির্বাচন নিয়ে বিভ্রান্তি কমবে।

৩. ওভারথ্রোর সংজ্ঞা আরও পরিষ্কার

ফিল্ডিংয়ের সময় কোন পরিস্থিতিকে ওভারথ্রো হিসেবে বিবেচনা করা হবে, সেটিও স্পষ্ট করা হয়েছে।

স্টাম্প লক্ষ্য করে রান আটকানো বা রানআউট করার চেষ্টা করতে গিয়ে কোনো ফিল্ডার বল ছুড়লে এবং সেখান থেকে বলের গতিপথ পরিবর্তিত হলে সেটি ওভারথ্রোর আওতায় পড়তে পারে। তবে বল থামাতে গিয়ে কোনো ফিল্ডারের সাধারণ ভুল বা একজন ফিল্ডার অন্যজনকে বল দিতে গিয়ে ভুল করলেই সেটিকে ওভারথ্রো হিসেবে ধরা হবে না।

এতে ফিল্ডিংয়ের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে রান গণনার ক্ষেত্রে আম্পায়ারদের জন্য আরও পরিষ্কার নির্দেশনা থাকবে।

৪. ‘ডেড বল’ নির্ধারণে আম্পায়ারের বাড়তি ক্ষমতা

বল কখন পুরোপুরি ‘ডেড’ হয়েছে, সে বিষয়ে আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রও আরও স্পষ্ট করা হয়েছে।

বিশেষ করে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে, যেমন শেষ বলের সময়, বল কার্যকরভাবে খেলায় আছে কি না—এই সিদ্ধান্ত ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন নিয়মে বল অবশ্যই বোলার বা উইকেটকিপারের হাতে থাকতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই।

পরিস্থিতি বিবেচনা করে আম্পায়ার বলকে ডেড ঘোষণা করতে পারবেন।

৫. রানআউট ও স্টাম্পিংয়ে বলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন

রানআউট বা স্টাম্পিংয়ের সময় ফিল্ডারের বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আছে কি না, সেটিও নতুন নিয়মে আরও নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

স্টাম্প ভাঙার সময় ফিল্ডারের হাত শুধু বলকে স্পর্শ করলেই সেটিকে বলের নিয়ন্ত্রণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। ফিল্ডারকে বলের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে।

দ্রুতগতির স্টাম্পিং কিংবা রানআউটের ক্ষেত্রে এই ব্যাখ্যা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ সামান্য পার্থক্যও উইকেটের সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে।

টেস্ট ক্রিকেটে নতুন নিয়ম

৬. দিনের টেস্টে গোলাপি বল ব্যবহারের সুযোগ

খারাপ আলোর কারণে দিনের টেস্টে খেলা বন্ধ হওয়ার ঘটনা কমাতে পরীক্ষামূলকভাবে গোলাপি বল ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।

তবে এই সিদ্ধান্ত ম্যাচ শুরুর আগেই নিতে হবে এবং দুই দলকে তাতে সম্মত হতে হবে। একবার গোলাপি বল ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে পুরো ম্যাচে একই ধরনের বল ব্যবহার করতে হবে।

ম্যাচ শুরু হওয়ার পর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা যাবে না। অর্থাৎ লাল বল দিয়ে শুরু করা কোনো টেস্ট পরিস্থিতি খারাপ হলে পরে গোলাপি বলে পরিবর্তন করা যাবে না।

৭. দিনের শেষ ওভার সম্পূর্ণ করতে হবে

টেস্টে দিনের শেষ ওভারে উইকেট পড়লেই খেলা শেষ করার সুযোগ আর থাকছে না। আবহাওয়া ও মাঠের পরিস্থিতি খেলার উপযোগী থাকলে ওই ওভারের বাকি বলগুলো সম্পন্ন করতে হবে।

আগের ব্যবস্থায় দিনের শেষ ওভারে উইকেট পড়ে গেলে খেলা থামিয়ে দেওয়া হলে বাকি বলগুলো পরদিন করতে হতো। এতে সময় ব্যবস্থাপনায় বাড়তি জটিলতা তৈরি হতে পারত।

নতুন নিয়মে খেলার উপযোগী পরিবেশ থাকলে নির্ধারিত ওভারটি শেষ করা হবে। এতে দিনের খেলা আরও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হবে।

ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে পরিবর্তন

৮. টি-টোয়েন্টিতে বিরতি কমানো যাবে

টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে দুই ইনিংসের মাঝের নির্ধারিত বিরতি এখন ১৫ মিনিট।

তবে ম্যাচে সময় নষ্ট হলে সেই বিরতি কমিয়ে সর্বনিম্ন ১০ মিনিট করা যাবে। এর মাধ্যমে ম্যাচ চলাকালে তৈরি হওয়া বিলম্ব কিছুটা সামলে নেওয়ার সুযোগ পাবেন ম্যাচ কর্মকর্তারা।

টি-টোয়েন্টির মতো নির্দিষ্ট সময়ের কাঠামোয় পরিচালিত ক্রিকেটে বিরতির দৈর্ঘ্য ম্যাচের সামগ্রিক সময় ব্যবস্থাপনায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।

৯. ড্রিংকস ব্রেকে মাঠে যেতে পারবেন হেড কোচ

ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ড্রিংকস ব্রেকের নিয়মও এক করা হয়েছে।

ড্রিংকস ব্রেকের সময় হেড কোচ অথবা তাঁর মনোনীত একজন মাঠে প্রবেশ করতে পারবেন। এর ফলে দুই সীমিত ওভারের ফরম্যাটে কোচিং স্টাফের মাঠে প্রবেশের ক্ষেত্রে একই নিয়ম কার্যকর হবে।

১০. ওয়াইড বলের নিয়ম এবার স্থায়ী

ওয়াইড বল নির্ধারণের একটি সংশোধিত নিয়ম আগে পরীক্ষামূলকভাবে চালু ছিল। এখন সেটিই ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে স্থায়ী নিয়ম হিসেবে কার্যকর হয়েছে।

ব্যাটার বল করার আগে বা বল করার সময় নিজের অবস্থান পরিবর্তন করলে বোলারকে ওয়াইডের ক্ষেত্রে অযথা দায়ী না করাই এই বিধানের অন্যতম উদ্দেশ্য।

নতুন নিয়মে বল ডেলিভারির মুহূর্তে ব্যাটারের পায়ের অবস্থানকে ওয়াইড নির্ধারণের মাপকাঠি হিসেবে ধরা হবে। বল করার পর ব্যাটার অফ সাইডের দিকে সরে গেলেও সেই পরবর্তী অবস্থান ওয়াইড নির্ধারণের ভিত্তি হবে না।

ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটেই প্রভাব পড়বে

নতুন নিয়মগুলোর কিছু সরাসরি মাঠের খেলায় প্রভাব ফেলবে, আবার কিছু পরিবর্তন ম্যাচ পরিচালনা ও আম্পায়ারিংয়ের সিদ্ধান্তকে আরও স্পষ্ট করবে। ব্যাটারের সময়ক্ষেপণের ক্ষেত্রে ৫ রানের শাস্তি, রানআউট ও স্টাম্পিংয়ে বলের নিয়ন্ত্রণের ব্যাখ্যা এবং ওভারথ্রোর সংজ্ঞা—এসব পরিবর্তন ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলতে পারে।

টেস্ট ক্রিকেটে গোলাপি বল ব্যবহারের সুযোগ এবং দিনের শেষ ওভার সম্পন্ন করার বিধান মূলত খেলার সময় ও পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে ওয়াইড বলের স্থায়ী নতুন ব্যাখ্যা এবং ড্রিংকস ব্রেকে কোচের মাঠে প্রবেশের অনুমতি দুই ফরম্যাটের নিয়মকে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করেছে।

১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক সিরিজগুলোতেই এসব সংশোধিত নিয়ম কার্যকর হচ্ছে। ফলে খেলোয়াড়, কোচ, আম্পায়ার ও ম্যাচ কর্মকর্তাদের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নতুন playing conditions এখন থেকেই প্রযোজ্য।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।