আফগানিস্তান কি আসলেই গাড়ি বানাচ্ছে?

গত কিছুদিন ধরে বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল একটি প্রশ্ন—”আফগানিস্তান যেখানে গাড়ি বানাতে পারছে, আমরা পারি না কেন?” এই প্রশ্নের পেছনে আবেগ থাকলেও বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল এবং ভিন্ন।

চলুন, তথ্য -উপাত্ত মিলিয়ে বুঝে নেওয়া যাক।

আফগানিস্তান কি সত্যিই গাড়ি বানাচ্ছে?

না, আফগানিস্তান এখনো পর্যন্ত গাড়ির পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনকারী দেশ হয়ে উঠেনি। তাদের যা কিছু প্রদর্শিত হচ্ছে, তা মূলত—

– শখের প্রকল্প বা প্রোটোটাইপ: কাবুলের একটি টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউটের কিছু শিক্ষার্থী এবং প্রকৌশলী মিলে “মাডা ৯” নামে একটি সুপারকার প্রোটোটাইপ বানিয়েছে। এটি মূলত একটি টয়োটা করোলার পুরনো ইঞ্জিন-এর উপর ভিত্তি করে তৈরি, শুধুমাত্র কাঠামো (chassis) ও বাহ্যিক ডিজাইনে পরিবর্তন এনে এটি একটি পরীক্ষামূলক মডেল হিসেবে নির্মিত।

– ফ্যাব্রিকেশন বা মডিফিকেশন: আফগানিস্তান-এর কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান গাড়ির শরীর ও কাঠামো তৈরি করছে ঠিকই, কিন্তু মূল ইঞ্জিন, গিয়ারবক্স, পার্টস—এসব সবই বিদেশি গাড়ির, বা কিছু ক্ষেত্রে মডিফাইড অংশ। অর্থাৎ এটি কোনো ধরনের সফল কমার্শিয়াল উৎপাদন বা কারখানাভিত্তিক অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রি নয়।

– বাণিজ্যিক উৎপাদন নেই: বর্তমানে আফগানিস্তানে এমন কোনো কারখানা নেই যেখানে প্রতি বছর আফগানিস্তানের জনগণের বা এক্সপোর্টের জন্য হাজার গাড়ি উৎপাদন হয়, গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী টেস্টিং হয় এবং বাজারে বিক্রি হয়।

বাংলাদেশ কি পিছিয়ে?

না, বাংলাদেশ অনেক আগেই এই ধাপগুলো অতিক্রম করেছে।

প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান) বহু বছর ধরেই— জিপ, ট্রাক, বাসের সংযোজন (অ্যাসেম্বলি) করছে। পাশাপাশি মিতসুবিশি ও আশোক লেল্যান্ড-এর সাথে যৌথভাবে বাণিজ্যিক যানবাহন তৈরি করছে। কারা কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বহু বছর ধরে যানবাহন সরবরাহ করে আসছে।

এছাড়া আলিফ অ্যাডভান্সড অটোমোটিভস, রানার অটোমোবাইলস, ওয়ালটন, এসিআই মোটরস ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান বাইক ও থ্রি-হুইলারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব সংযোজন ও উৎপাদন সক্ষমতা ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে।

বাংলাদেশে অনেক এখন কোম্পানি ট্রাক, বাস ও পিকআপের সিকেডি (কমপ্লিটলি নকড ডাউন) কিট এনে সংযোজন করছে, যা উৎপাদনের একটা গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

বাংলাদেশে অনেক আগে থেকে এমেচার গাড়ির কাস্টমাইজেশন বা মডিফিকেশন বেশ জনপ্রিয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গাড়ির বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন করে থাকে। হ্যাচব্যাক, সেডান, এসইউভি সহ বিভিন্ন ধরণের গাড়ির মডিফিকেশন করা হয়। গাড়ির ইন্টেরিয়র, এর পাশাপাশি গাড়ির পারফরম্যান্স উন্নত করার জন্য ইঞ্জিন মডিফিকেশনও করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটপ্লেস এবং ফিজিক্যাল শোরুমে গাড়ির মডিফিকেশনের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও সার্ভিসেস পাওয়া যায়। তবে এমেচার গাড়ি মডিফিকেশন বাংলাদেশে কিছু আইনগত জটিলতার মাধ্যমে নিরুৎসাহিত করা হয়।

তাহলে এই ভুল ধারণা কেন?

এটি মূলত ভিজ্যুয়াল ও আবেগনির্ভর বিভ্রান্তি। আফগানিস্তানের মাডা ৯ গাড়িটির বাহ্যিক ডিজাইন আকর্ষণীয়। স্যোশাল মিডিয়ায় ছবিতে দেখে অনেকেই মনে করছেন ওটা টোয়টা, টেসলা বা ফেরারি-এর মতো কোনো দেশীয় উদ্ভাবন। কিন্তু বিষয়টি হলো, এটা কোনো পূর্ণাঙ্গ ফাংশনাল গাড়ি নয়, বরং একটি স্টুডেন্ট প্রজেক্ট টাইপ প্রোটোটাইপ।

গর্বিত হোন বাস্তব উন্নয়নে:

আফগানিস্তান যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ, যাদের এ ধরনের প্রজেক্ট নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে তা এখনও খুব প্রাথমিক পর্যায়ের।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বাস্তব সক্ষমতা অর্জন করেছে, শুধু দরকার আরও প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ, আর অ্যান্ড ডি এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগকে উৎসাহ দেওয়া।

সুতরাং, আফগানিস্তান গাড়ি বানাচ্ছে আর আমরা পারছি না—এ ধারণাটি আবেগপ্রসূত এবং বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

 

তথ্যসূত্র:

– এনটপ মাডা ৯ (আফগানিস্তান সুপারকার) প্রজেক্ট রিপোর্ট —কাবুল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট 
– প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ অফিসিয়াল প্রতিবেদন ও এমওইউ
– ওয়ালটন অ্যান্ড রানার অটোমোবাইল অ্যানাল রিপোর্ট
– অটো ইন্ডাস্ট্রি ইনসাইট-বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যাথোরিটি (বিডা)

 

 

লেখক – সম্পাদক ও প্রকাশক ” খবরওয়ালা ”
 

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।