বলিউডের বহুল আলোচিত ছবি ‘আলফা’ প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসায়িক সাফল্য না পেলেও ছবিটির সংগীত নিয়ে সন্তুষ্ট আবর পণ্ডিত ও রোহানশ পণ্ডিত। বরং বড় একটি চলচ্চিত্রের পুরো সংগীত অ্যালবামের দায়িত্ব অল্প বয়সে পাওয়াকেই নিজেদের ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখছেন ললিত পণ্ডিতের দুই ছেলে। তাঁদের কাছে ‘আলফা’ কেবল একটি চলচ্চিত্রের কাজ নয়, বরং পেশাদার সংগীতজীবনের প্রথম বড় অধ্যায়।
আবর ও রোহানশ ‘আলফা’র মাধ্যমে গায়ক ও সংগীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। আলিয়া ভাট ও শর্বরী অভিনীত ছবিটির সংগীত তৈরির সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছিল তাঁদের ওপর। কাজটি যখন শুরু হয়, তখন আবরের বয়স মাত্র ১৮ বছর এবং রোহানশের ২১। এত অল্প বয়সে যশরাজ ফিল্মসের মতো প্রতিষ্ঠিত প্রযোজনা সংস্থার বড় বাজেটের একটি গুপ্তচরভিত্তিক ছবির সংগীত পরিচালনার সুযোগ পাওয়া তাঁদের জন্য একই সঙ্গে সম্মান ও বড় দায়িত্বের বিষয় ছিল।
দুই ভাইয়ের বক্তব্য, একসঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত তাঁদের আলাদা করে নিতে হয়নি। সংগীতের প্রতি একই ধরনের আগ্রহ এবং পরস্পরের সঙ্গে বোঝাপড়ার কারণেই যৌথভাবে কাজ করার বিষয়টি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। তাঁদের সৃজনশীল চিন্তায় সব সময় মিল থাকে না। তবে মতপার্থক্যকে তাঁরা বাধা হিসেবে দেখেন না। বরং আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন ধারণা যাচাই করে যে ভাবনাটি ছবির প্রয়োজনের সঙ্গে সবচেয়ে ভালোভাবে মানানসই হয়, সেটিই গ্রহণ করেন।
এই সংগীতযাত্রায় বাবা ললিত পণ্ডিতের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। ললিত পণ্ডিত ও তাঁর ভাই যতীন পণ্ডিত হিন্দি চলচ্চিত্রের সংগীতজগতে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই সংগীতের পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন আবর ও রোহানশ। পারিবারিক ঐতিহ্য তাঁদের অনুপ্রেরণা জোগালেও নিজেদের আলাদা পরিচয় প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টিকেও তাঁরা গুরুত্ব দিচ্ছেন।
‘আলফা’র কাজ শুরুর আগে বাবার কাছ থেকে পাওয়া কিছু পরামর্শ তাঁদের আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। ললিত পণ্ডিত তাঁদের জানিয়েছিলেন, শিল্পীর জীবনে সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতাও আসবে। কিন্তু ফলাফলের চেয়ে সংগীতের প্রতি ভালোবাসা এবং নিজের শিল্পীসত্তার প্রতি সততা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি নতুন কাজকে প্রথম কাজের মতো গুরুত্ব দিয়ে করার পাশাপাশি কোনো একটি ছবির সাফল্য বা ব্যর্থতাকে ব্যক্তিগত মূল্যায়নের মাপকাঠি না করার পরামর্শও তিনি দিয়েছেন।
আবরের চলচ্চিত্রে পথচলার শুরুটিও ছিল ভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। ‘ওয়ার ২’-এর শুটিংয়ে তিনি সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছিলেন। সেই সময় একটি বড় চলচ্চিত্রের শুটিং কীভাবে পরিচালিত হয়, বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে কীভাবে সমন্বয় তৈরি করা হয় এবং তারকারা কীভাবে কাজ করেন—এসব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান তিনি। নির্মাতা অয়ন মুখার্জির কাজের ধরনও পর্যবেক্ষণ করেন। পরবর্তী সময়ে ‘আলফা’র মতো বড় প্রকল্পে কাজ করার ক্ষেত্রে সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে সহায়তা করেছে।
অভিনয়ের প্রতিও আবরের আগ্রহ রয়েছে। ভবিষ্যতে সংগীতের পাশাপাশি অভিনয়েও কাজ করার ইচ্ছা তিনি প্রকাশ করেছেন। তবে এই মুহূর্তে তাঁর প্রধান মনোযোগ সংগীতেই।
‘আলফা’র দায়িত্ব পাওয়ার সময় দুই ভাইয়ের ওপর প্রত্যাশার চাপও ছিল যথেষ্ট। ছবিটি ছিল যশরাজ ফিল্মসের গুপ্তচরজগতের অংশ এবং দুই নারীকে কেন্দ্র করে নির্মিত বড় পরিসরের অ্যাকশন চলচ্চিত্র। এমন একটি প্রকল্পের পুরো সংগীত অ্যালবাম তৈরি করা অভিজ্ঞ শিল্পীদের জন্যও চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। সেখানে আবর ও রোহানশের মতো তরুণদের জন্য দায়িত্বটি ছিল আরও বড়।
তবে ছবির পরিচালক শিব রাওয়াল শুরু থেকেই সংগীতের ধরন ও প্রয়োজন সম্পর্কে তাঁদের পরিষ্কার ধারণা দিয়েছিলেন। প্রযোজক আদিত্য চোপড়ার দিকনির্দেশনাও তাঁদের কাজের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ফলে বয়স কম হলেও পরিকল্পনা ও দলগত কাজের মাধ্যমে তাঁরা অ্যালবামটি সম্পন্ন করেন।
ছবিটি প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসা না করায় তাঁদের কষ্ট হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে রোহানশের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট। তাঁর মতে, ‘আলফা’র সঙ্গে যুক্ত পরিচালক, অভিনয়শিল্পী, সংগীতশিল্পী এবং অন্য কলাকুশলীরা দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। ছবিটির নির্মাণ ও সংগীতের পেছনে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ চলেছে। তাই বাণিজ্যিক ফলাফল প্রত্যাশামতো না হলেও নিজেদের সৃষ্টিশীল অবদান নিয়ে তাঁদের গর্ব রয়েছে।
রোহানশ মনে করেন, প্রতিটি চলচ্চিত্রের ফলাফল আলাদা এবং কোনো একটি ছবির ভাগ্য দিয়ে একজন শিল্পীর দীর্ঘ ক্যারিয়ার বিচার করা যায় না। বিশেষ করে প্রথম ছবি একজন শিল্পীর জীবনে একবারই আসে। সেই প্রথম সুযোগটিই যদি যশরাজ ফিল্মসের মতো প্রতিষ্ঠানের ছবিতে হয়, তাহলে সেটিকে তাঁরা নিজেদের জন্য সৌভাগ্যের বিষয় হিসেবে দেখছেন।
‘আলফা’ গত ৩ জুলাই প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। পরে ২৮ আগস্ট ছবিটি নেটফ্লিক্সে মুক্তি দেওয়া হয়। প্রেক্ষাগৃহে প্রত্যাশিত সাড়া না পেলেও ছবিটির মাধ্যমে দুই তরুণ সংগীতশিল্পী বড় পরিসরের চলচ্চিত্র নির্মাণপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
আগামী দিনে আবর ও রোহানশ নিজেদের স্বতন্ত্র সংগীতপরিচয় তৈরি করতে চান। বিভিন্ন ধরনের সুর নিয়ে কাজ করা, নতুন শিল্পীদের সঙ্গে সহযোগিতা করা এবং নিজেদের সংগীত প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। তাঁদের দৃষ্টিতে ‘আলফা’ কোনো শেষ অধ্যায় নয়। বরং এই ছবির মাধ্যমে পাওয়া অভিজ্ঞতা সামনে আরও বড় ও বৈচিত্র্যময় সংগীতযাত্রার ভিত্তি তৈরি করেছে।


