ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে মুখে টেপ লাগানো অবস্থায় উদ্ধার হওয়া ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করেছে পুলিশ। তিনি ৫০ বছর বয়সী ইসমাইল হোসেন। মেয়ের বিয়ের আয়োজনের জন্য গ্রামের জমি বিক্রি করে পাওয়া নগদ টাকা সঙ্গে নিয়ে জামালপুর থেকে গাজীপুরে ফেরার পথেই তিনি নিখোঁজ হন। পরে এক্সপ্রেসওয়ের ওপর তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়।
শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে স্বজনেরা ইসমাইলের মরদেহ শনাক্ত করেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আঙুলের ছাপের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।
ইসমাইল জামালপুর সদর উপজেলার জালাল উদ্দিনের ছেলে। তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর এলাকায় স্ত্রী, দুই সন্তান ও ছেলের বউকে নিয়ে বসবাস করতেন। প্রায় নয় মাস আগে অসুস্থতার কারণে ডেল্টা স্পিনিং মিলে নিরাপত্তাকর্মীর চাকরি ছেড়ে দেন। চাকরি ছাড়ার পরও তিনি গাজীপুরেই ছিলেন। তবে প্রায় চার মাস আগে গ্রামের বাড়ি জামালপুরে ফিরে যান। সেখানে তাঁর মা ও বড় বোন থাকেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ইসমাইলের একমাত্র মেয়ে শারমিনের বিয়ের কথা চলছিল। বিয়ের দিন-তারিখ চূড়ান্ত করার উদ্দেশ্যেই তিনি গাজীপুরে ফিরছিলেন। এ জন্য জামালপুরের গ্রামের বাড়ির প্রায় ১১ শতাংশ জমি সাড়ে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছিলেন। জমি বিক্রির অর্থ থেকে আগের দুই লাখ টাকার ঋণ পরিশোধ করেন এবং গ্রামের বাড়িতে একটি ঘর তৈরিতে কিছু টাকা ব্যয় করেন। বাকি প্রায় পাঁচ লাখ টাকা নগদ তাঁর সঙ্গে ছিল বলে পরিবার জানিয়েছে।
ইসমাইলের ছেলে হাসান বলেন, তাঁর বাবার কাছে নগদ টাকার পাশাপাশি একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন ও একটি বাটন ফোন ছিল। মরদেহ উদ্ধারের পর এসবের কোনোটি পাওয়া যায়নি বলে তিনি জানান। পরিবারের ধারণা, সঙ্গে থাকা টাকা ও অন্যান্য জিনিসপত্রও নিখোঁজ হয়েছে।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে জামালপুর থেকে গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা হন ইসমাইল। রাতে তিনি ছেলেকে ফোন করে জানান, সকালে গাজীপুরে পৌঁছাবেন। সকালে তাঁর জিরানী এলাকায় নামার কথা ছিল। সে অনুযায়ী ছেলে রাসেল সেখানে গিয়ে অপেক্ষা করেন এবং বাবার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এরপর পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে বনানী থানা থেকে জামালপুরের পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়। পরে পুলিশের কাছ থেকে খবর পেয়ে স্বজনেরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে ইসমাইলের মরদেহ শনাক্ত করেন।
শুক্রবার সকালে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর থেকে ইসমাইলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর মুখে টেপ লাগানো ছিল। পরনে ছিল অটোরিকশাচালকদের ইউনিফর্মের মতো নীল রঙের শার্ট এবং লুঙ্গি। মরদেহটি কীভাবে সেখানে পৌঁছাল, তা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
বনানী থানার উপপরিদর্শক নজরুল ইসলাম তালুকদার জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ইসমাইলকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার পর কোনো একটি গাড়িতে করে এক্সপ্রেসওয়ের ওপর নিয়ে মরদেহ ফেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে হত্যার কারণ, ঘটনাস্থল এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পুরো এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে নিরাপত্তা ক্যামেরা থাকায় তদন্তকারীরা সংশ্লিষ্ট ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করছেন। কোন গাড়িতে করে মরদেহটি আনা হয়েছিল এবং সেটি কোথা থেকে এক্সপ্রেসওয়েতে উঠেছিল, তা শনাক্তের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে ইসমাইল জামালপুর থেকে গাজীপুরে ফেরার পথে কোথায় এবং কীভাবে নিখোঁজ হলেন, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজের তথ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। পরিবারের কাছে মেয়ের বিয়ের জন্য রাখা পাঁচ লাখ টাকা না ফেরার ঘটনাটিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।


